টপিক 12 / ৫৮পাকিস্তান আমল (১৯৪৭–১৯৭০)📖 স্টাডি নোট

টপিক ১২: ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলন

অধ্যায় ১২: বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ ও স্বাধিকার আন্দোলন (১৯৪৭–১৯৭০) #

২.১ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা ও পূর্ব বাংলার প্রতি বৈষম্যের স্বরূপ (১৯৪৭) #

১৯৪৭ সালের ১৮ জুলাই ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ‘ভারত স্বাধীনতা আইন’ (Indian Independence Act 1947) পাস হয় এবং স্যার সিরিল র‍্যাডক্লিফের সীমানা কমিশন রোয়েদাদ (র‍্যাডক্লিফ লাইন, প্রকাশ: ১৭ আগস্ট ১৯৪৭) অনুযায়ী অবিভক্ত বাংলা ও পাঞ্জাব বিভক্ত হয়। ১৪ আগস্ট ১৯৪৭ পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়।

  • পাকিস্তানের ভৌগোলিক অসামঞ্জস্য: পূর্ব বাংলা (১৯৫৫ সালে নামকরণ করা হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান’) ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার ব্যবধান ছিল প্রায় ১,২০০ মাইল (প্রায় ২,০০০ কিলোমিটার) ভারতীয় ভূখণ্ড।
  • পাকিস্তান ও পূর্ব বাংলার প্রথম শাসকবৃন্দ (১৯৪৭):
পদবি প্রথম দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
পাকিস্তানের প্রথম গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১১ সেপ্টেম্বর ১৯৪৮ মৃত্যু পর্যন্ত; দ্বিতীয় গভর্নর জেনারেল খাজা নাজিমউদ্দীন।
পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ১৬ অক্টোবর ১৯৫১ রাওয়ালপিন্ডিতে আততায়ীর গুলিতে নিহত হন।
পাকিস্তানের প্রথম প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল ইস্কান্দার মির্জা ১৯৫৬ সালের ২৩ মার্চ প্রথম সংবিধান কার্যকর হলে প্রথম প্রেসিডেন্ট হন।
পূর্ব বাংলার প্রথম গভর্নর স্যার ফ্রেডারিক চার্লস বোর্ন প্রথম বাঙালি গভর্নর ছিলেন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক (১৯৫৬)।
পূর্ব বাংলার প্রথম মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দীন পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী: নূরুল আমিন (১৯৪৮–১৯৫৪, ভাষা আন্দোলনের সময়), এ কে ফজলুল হক (১৯৫৪), আবু হোসেন সরকার, আতাউর রহমান খান।
বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ ও স্বাধিকার আন্দোলনের ধারাবাহিক প্রবাহ ১৯৪৭ ভাষা আন্দোলন থেকে ১৯৭০-এর ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচন ১৯৪৭ – ১৯৫২ ভাষা আন্দোলন • তমদ্দুন মজলিস (২ সেপ্টেম্বর ১৯৪৭) ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ রক্তের বিনিময়ে বাংলা রাষ্ট্রভাষা ১৯৪৯ ও ১৯৫৪ যুক্তফ্রন্ট বিজয় • ২৩ জুন ১৯৪৯: আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা মার্চ ১৯৫৪: যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা, নৌকা প্রতীকে ২২৩ আসন ১৯৬২ ও ১৯৬৬ মুক্তিসনদ ৬ দফা • ৫–৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৬: লাহোরে ৬ দফা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উত্থাপিত ঐতিহাসিক মুক্তিসনদ ১৯৬৮ – ১৯৬৯ গণঅভ্যুত্থান • আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্তি ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯: শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি প্রদান ৭ ডিসেম্বর ১৯৭০: ঐতিহাসিক সাধারণ নির্বাচন আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদে ১৬৭টি আসন (১৬২+৫) লাভ করে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে

২.২ রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন (১৯৪৭ – ১৯৫৬): বাঙালি জাতীয়তাবাদের সূতিকাগার #

১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ৫৬.৪০% (প্রায় ৫৬%) মানুষের মাতৃভাষা ছিল বাংলা। অপরদিকে মাত্র ৩.২৭% (সমগ্র পাকিস্তানে প্রায় ৬%–৭%) অভিজাত ও মুহাজির জনগোষ্ঠীর ভাষা ছিল উর্দু। তবুও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ষড়যন্ত্র শুরু করে।

ভাষা আন্দোলনের প্রথম পর্যায় (১৯৪৭ – ১৯৪৮) #

তারিখ ও সাল ঐতিহাসিক ঘটনা ও তাৎপর্য
জুলাই ১৯৪৭ আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দিন আহমদ উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব দেন। এর প্রতিবাদে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ দৈনিক আজাদ পত্রিকায় ‘পাকিস্তানের ভাষা সমস্যা’ প্রবন্ধে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার যৌক্তিকতা তুলে ধরেন এবং ড. এনামুল হক প্রতিবাদ জানান।
৬–৭ সেপ্টেম্বর ১৯৪৭ ঢাকায় অনুষ্ঠিত কর্মী সম্মেলনে ‘গণতান্ত্রিক যুবলীগ’ গঠিত হয় (ভাষা বিষয়ক প্রস্তাব পাঠ করেন ছানাউল হক ও তাসাদ্দুক আহমদ)।
১/১ সেপ্টেম্বর ১৯৪৭ (বাংলাপিডিয়া; মতান্তরে ২ সেপ্টেম্বর ১৯৪৭) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাশেমের নেতৃত্বে গঠিত হয় ভাষা আন্দোলনের প্রথম সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘তমদ্দুন মজলিস’।
১৫ সেপ্টেম্বর ১৯৪৭ তমদ্দুন মজলিস ভাষা আন্দোলনের প্রথম পুস্তিকা ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা: বাংলা না উর্দু?’ প্রকাশ করে। পুস্তিকাটির ৩ জন লেখক ছিলেন: ১. অধ্যাপক আবুল কাশেম, ২. ড. কাজী মোতাহার হোসেন ও ৩. আবুল মনসুর আহমদ।
অক্টোবর ১৯৪৭ তমদ্দুন মজলিসের উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নের অধ্যাপক নুরুল হক ভূঁইয়াকে আহ্বায়ক করে প্রথম ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়।
ডিসেম্বর ১৯৪৭ করাচিতে অনুষ্ঠিত শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব গৃহীত হয় এবং পোস্টকার্ড, মানিঅর্ডার ফরম, মুদ্রা ও ডাকটিকিট থেকে বাংলা ভাষা বাদ দেওয়া হয়।
২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮ পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম অধিবেশনে ইংরেজি ও উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকে গণপরিষদের অন্যতম ভাষা করার দাবি জানান কুমিল্লার কংগ্রেস দলীয় সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ও পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দীন এর তীব্র বিরোধিতা করেন।
২ মার্চ ১৯৪৮ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে শামসুল আলমকে আহ্বায়ক করে প্রথম ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ পুনর্গঠিত হয়।
১১ মার্চ ১৯৪৮ ‘বাংলা ভাষা দাবি দিবস’ উপলক্ষে সমগ্র পূর্ব বাংলায় সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয়। সচিবালয়ের সামনে পিকেটিং করতে গিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান, শামসুল হক, অলি আহাদ, কাজী গোলাম মাহবুবসহ ৬৯ জন গ্রেপ্তার হন। ১৯৪৮–১৯৫২ সাল পর্যন্ত ১১ মার্চ ‘ভাষা দিবস’ হিসেবে পালিত হতো।
১৫ মার্চ ১৯৪৮ ছাত্র আন্দোলনের মুখে মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দীন রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সাথে ৮ দফা চুক্তি স্বাক্ষর করেন এবং বন্দিদের মুক্তি দেন।
১৯ মার্চ ১৯৪৮ পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় আসেন। ২১ মার্চ ১৯৪৮ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এবং ২৪ মার্চ ১৯৪৮ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে সমাবর্তন অনুষ্ঠানে জিন্নাহ ঘোষণা করেন— “Urdu and Urdu shall be the state language of Pakistan” (উর্দু এবং একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা)। কার্জন হলে উপস্থিত ছাত্ররা সাথে সাথে “No, No” (না, না) বলে প্রতিবাদ জানায়।
১১ সেপ্টেম্বর ১৯৪৮ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক নির্বাচিত হন আবদুল মতিন (‘ভাষা মতিন’ নামে খ্যাত)।
১১ মার্চ ১৯৫০ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আবদুল মতিনকে আহ্বায়ক করে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়।

ভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায় (১৯৫২) #

  • ২৭ জানুয়ারি ১৯৫২: পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দীন ঢাকার পল্টন ময়দানে ঘোষণা করেন, “পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু”। এতে সমগ্র পূর্ব বাংলা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে।
  • ৩০ জানুয়ারি ১৯৫২: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মঘট পালিত হয়।
  • ৩১ জানুয়ারি ১৯৫২: ঢাকা বার লাইব্রেরি হলে মাওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় কাজী গোলাম মাহবুবকে আহ্বায়ক করে ৪০ সদস্যবিশিষ্ট ‘সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়। সভায় ২১শে ফেব্রুয়ারি সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল ও ‘রাষ্ট্রভাষা দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
  • ৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২: ঢাকা শহরের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র ধর্মঘট ও বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।
  • ১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২: কারাবন্দি শেখ মুজিবুর রহমান ও মহিউদ্দিন আহমেদকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ফরিদপুর কারাগারে স্থানান্তর করা হলে তাঁরা রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আমরণ অনশন শুরু করেন।
  • ২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২: নূরুল আমিন সরকার ঢাকা শহরে ২০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা থেকে ১ মাসের জন্য ১৪৪ ধারা (সকল প্রকার মিছিল-সমাবেশ নিষিদ্ধ) জারি করে। ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে ৯৪ নবাবপুর রোডে আবুল হাশিমের সভাপতিত্বে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের বৈঠকে সংখ্যাগরিষ্ঠ (১১-৪ ভোটে) সদস্য ১৪৪ ধারা না ভাঙার পক্ষে মত দিলেও আবদুল মতিন ও গাজীউল হকসহ ছাত্রনেতারা ১৪৪ ধারা ভাঙার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তে অটল থাকেন।
  • ২১শে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ (৮ই ফাল্গুন ১৩৫৮ বঙ্গাব্দ, বৃহস্পতিবার):
    • ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় (বর্তমান ঢাকা মেডিকেল কলেজ জরুরি বিভাগের পাশে কলাভবন প্রাঙ্গণে) গাজীউল হকের সভাপতিত্বে ছাত্রদের ঐতিহাসিক সভা অনুষ্ঠিত হয়।
    • আবদুস সামাদের প্রস্তাব অনুযায়ী ১০ জন করে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাজপথে বের হওয়ার সিদ্ধান্ত হয় (ছাত্রীদের প্রথম দলটির নেতৃত্ব দেন শাফিয়া খাতুন, রওশন আরা বাচ্চু, হালিমা খাতুন ও সুফিয়া ইব্রাহিম)।
    • বেলা ৩টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে (তৎকালীন প্রাদেশিক পরিষদ ভবনের অদূরে) পুলিশ ছাত্রদের ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করে।
    • একুশে ফেব্রুয়ারি ও ২২শে ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে শহীদ হন: রফিক, বরকত, জব্বার, সালাম, শফিউর ও অহিউল্লাহ।

বায়ান্নর ভাষা শহিদদের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় #

ভাষা শহিদের নাম জন্মস্থান / জেলা পেশা ও পরিচয় শহিদ হওয়ার তারিখ ও সমাধি
১. রফিকউদ্দিন আহমদ পারিল গ্রাম, সিঙ্গাইর, মানিকগঞ্জ (দেবেন্দ্র কলেজের ছাত্র ছিলেন) পিতার মুদ্রণ ছাপাখানা ব্যবসায় যুক্ত ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ (ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহিদ; মাথায় গুলি লাগে)। সমাধি: আজিমপুর কবরস্থান (অচিহ্নিত)। ২০০০ সালে মরণোত্তর একুশে পদক লাভ।
২. আবুল বরকত বাবলা গ্রাম, ভরতপুর, মুর্শিদাবাদ (ভারত); পরে ঢাকায় স্থায়ী হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের এম.এ. শ্রেণির ছাত্র ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ (রাত ৮টায় ঢাকা মেডিকেলে মৃত্যুবরণ করেন)। সমাধি: আজিমপুর কবরস্থান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ভাষা শহিদ আবুল বরকত জাদুঘর’ রয়েছে।
৩. আবদুল জব্বার পাঁচুয়া গ্রাম, গফরগাঁও, ময়মনসিংহ দরিদ্র কৃষক ও আনসার কমান্ডার (ক্যান্সার আক্রান্ত শাশুড়ির চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেলে এসেছিলেন) ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ রাতে ঢাকা মেডিকেলে শহিদ হন। সমাধি: আজিমপুর কবরস্থান।
৪. আবদুস সালাম লক্ষ্মণপুর (বর্তমান সালাম নগর), দাগনভূঞা, ফেনী তৎকালীন ডিরেক্টরেট অব ইন্ডাস্ট্রিজ (শিল্প ও বাণিজ্য বিভাগ)-এর পিয়ন / রেকর্ড কিপার ২১ ফেব্রুয়ারি গুলিবিদ্ধ হয়ে দেড় মাস চিকিৎসাধীন থাকার পর ৭ এপ্রিল ১৯৫২ শহিদ হন।
৫. শফিউর রহমান কোন্নগর, হুগলি (পশ্চিমবঙ্গ) ঢাকা হাইকোর্টের হিসাবরক্ষণ শাখার কেরানি ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ নবাবপুর রোডে মিছিলে পুলিশের গুলিতে শহিদ হন। সমাধি: আজিমপুর কবরস্থান (চিহ্নিত কবরের পাশে)।
৬. অহিউল্লাহ ও আঃ আউয়াল ঢাকা অহিউল্লাহ (৮/৯ বছর বয়সী রাজমিস্ত্রির শিশু পুত্র — কনিষ্ঠতম ভাষা শহিদ) এবং রিকশাচালক আবদুল আউয়াল ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ নবাবপুর ও বংশাল এলাকায় শহিদ হন।

শহিদ মিনার, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি #

  • প্রথম শহিদ মিনার: ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা (নকশাকার: বদরুল আলম ও সাঈদ হায়দার) ১০/১১ ফুট উঁচু প্রথম শহিদ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেন।
    • অনানুষ্ঠানিক উদ্বোধন: ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সকালে শহিদ শফিউর রহমানের পিতা মৌলভী মাহবুবুর রহমান।
    • আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন: ২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সকালে দৈনিক আজাদ পত্রিকার সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দীন (২১ ফেব্রুয়ারি গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে তিনি প্রাদেশিক পরিষদ বা আইনসভার সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন)। ২৬ ফেব্রুয়ারি বিকেলেই পুলিশ প্রথম শহিদ মিনারটি ভেঙে ফেলে।
  • বর্তমান কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার: ১৯৫৭ সালে মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খানের আমলে এর কাজ শুরু হয় এবং ১৯৬৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি শহিদ বরকতের মাতা হাসিনা বেগম এর উদ্বোধন করেন। এর স্থপতি চিত্রশিল্পী হামিদুর রহমান (সহযোগী ভাস্কর নভেরা আহমেদ)।
  • রাজশাহী কলেজের শহিদ মিনার: ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ রাতেই রাজশাহী কলেজ প্রাঙ্গণে দেশের প্রথম দিকের একটি শহিদ মিনার নির্মিত হয়েছিল।
  • দেশের সর্বোচ্চ শহিদ মিনার: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থিত (উচ্চতা: ৭১ ফুট; ভিত্তিপ্রস্তর ব্যাস ৫২ ফুট; স্থপতি: রবিউল হুসাইন)।

ভাষা আন্দোলনভিত্তিক প্রথম ও বিখ্যাত সৃষ্টিসমূহ (এক নজরে ছক) #

ক্যাটাগরি নাম / শিরোনাম রচয়িতা / স্রষ্টা / পরিচালক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
প্রথম কবিতা ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’ মাহবুব উল আলম চৌধুরী চট্টগ্রামে বসে রচিত; ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ লালদীঘি ময়দানে হারুনুর রশীদ পাঠ করেন।
প্রথম গান ‘ভুলব না, ভুলব না, একুশে ফেব্রুয়ারি ভুলব না’ গীতিকার: ভাষাসৈনিক আ ন ম গাজীউল হক সুরকার: নিজাম উল হক।
সর্বাধিক জনপ্রিয় একুশের গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’ গীতিকার: আবদুল গাফফার চৌধুরী প্রথম সুরকার: আবদুল লতিফ; বর্তমান সুরকার: শহিদ আলতাফ মাহমুদ (১৯৫৪)।
বিখ্যাত ভাষা সংগীত ‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’ কথা ও সুর: আবদুল লতিফ ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’ — ফজল-এ-খোদা (শিল্পী: আব্দুল জব্বার)। ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে’ — গোবিন্দ হালদার।
প্রথম নাটক ‘কবর’ (১৯৫৩) মুনীর চৌধুরী ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি অবস্থায় রচনা করেন; ২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৩ কারাগারে ফণী চক্রবর্তীর নির্দেশনায় প্রথম মঞ্চস্থ হয়।
প্রথম উপন্যাস ‘আরেক ফাল্গুন’ (১৯৬৯) জহির রায়হান বিখ্যাত উক্তি: “আসছে ফাল্গুনে আমরা কিন্তু দ্বিগুণ হব।” (জহির রায়হানের ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ নামেও একটি গ্রন্থ আছে)। শওকত ওসমানের উপন্যাস: ‘আর্তনাদ’ এবং সেলিনা হোসেনের ‘নিরন্তর ঘণ্টাধ্বনি’ ও ‘যাপিত জীবন’।
প্রথম সংকলন গ্রন্থ ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ (মার্চ ১৯৫৩) সম্পাদক: হাসান হাফিজুর রহমান প্রকাশক: মোহাম্মদ সুলতান (পুঁথিপত্র প্রকাশনী)।
প্রথম চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেয়া’ (মুক্তি: এপ্রিল ১৯৭০) পরিচালক: জহির রায়হান ভাষা আন্দোলন ও আইয়ুব বিরোধী গণআন্দোলনের রূপক চলচ্চিত্র। তৌকীর আহমেদের ভাষা আন্দোলনভিত্তিক চলচ্চিত্র: ‘ফাগুন হাওয়ায়’ (২০১৯; টিটো রহমানের ‘বউ কথা কও’ গল্প অবলম্বনে)।
ভাস্কর্য ‘মোদের গরব’ (বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ) ভাস্কর: অখিল পাল ৫ জন ভাষা শহিদের আবক্ষ ভাস্কর্য। ‘অমর একুশে’ (জাবি) — জাহানারা পারভীন।
  • রাষ্ট্রভাষা হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি (১৯৫৬): ১৯৫৪ সালের ৭ মে পাকিস্তান গণপরিষদ বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং ২৩ মার্চ ১৯৫৬ কার্যকর হওয়া পাকিস্তানের প্রথম সংবিধানের ২১৪(১) অনুচ্ছেদে উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
  • আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি (১৯৯৯): কানাডার ভ্যাঙ্কুভার প্রবাসী দুই বাঙালি রফিকুল ইসলাম ও আবদুস সালাম কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ‘Mother Language Lovers of the World’ সংগঠনের উদ্যোগে এবং বাংলাদেশ সরকারের (তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী এ এস এইচ কে সাদেক) আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবে ১৭ নভেম্বর ১৯৯৯ ইউনেস্কোর (UNESCO) প্যারিসে অনুষ্ঠিত ৩০তম সাধারণ সম্মেলনে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ (International Mother Language Day) হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
    • ২০০০ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি থেকে বিশ্বব্যাপী (১৮৮+ দেশে) দিবসটি পালিত হচ্ছে।
    • ৫ ডিসেম্বর ২০০৮ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদও ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়।
    • পশ্চিম আফ্রিকার দেশ সিয়েরা লিওন (২০০২ সালে) বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলা ভাষাকে তাদের দ্বিতীয় সরকারি/অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করে।
    • আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট (IMLI): ঢাকার সেগুনবাগিচায় অবস্থিত (ভিত্তিপ্রস্তর ১৫ মার্চ ২০০১ — কফি আনান ও শেখ হাসিনা; উদ্বোধন ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১০; ইউনেস্কোর Category-2 Institute স্বীকৃতি লাভ করে ২০১৫ সালে)।

১২.২ স্বাধিকার আন্দোলন — মাস্টার রেফারেন্স সারণি #

আন্দোলন / ঘটনা / সংগঠন তারিখ ও বছর প্রধান উদ্যোক্তা / ব্যক্তিত্ব ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত ও পরীক্ষার মূল তথ্য
তমদ্দুন মজলিস প্রতিষ্ঠা ১ সেপ্টেম্বর ১৯৪৭ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক আবুল কাশেম ভাষা আন্দোলনের প্রথম সাংস্কৃতিক সংগঠন; মুখপত্র ‘সাপ্তাহিক সৈনিক’
‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু?’ পুস্তিকা ১৫ সেপ্টেম্বর ১৯৪৭ অধ্যাপক আবুল কাশেম, ড. কাজী মোতাহার হোসেন ও আবুল মনসুর আহমদ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে প্রকাশিত প্রথম পুস্তিকা
প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন ১ অক্টোবর ১৯৪৭ আহ্বায়ক: অধ্যাপক নূরুল হক ভূঁইয়া তমদ্দুন মজলিসের উদ্যোগে গঠিত
করাচি শিক্ষা সম্মেলন ডিসেম্বর ১৯৪৭ পাকিস্তানের শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমানের উদ্যোগ উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব গৃহীত হয়
পাকিস্তান গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাব ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮ (করাচি অধিবেশন) কুমিল্লার গণপরিষদ সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ইংরেজি ও উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকে গণপরিষদের দাফতরিক ভাষা করার দাবি
সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ (১৯৪৮) ২ মার্চ ১৯৪৮ (ফজলুল হক মুসলিম হল) আহ্বায়ক: শামসুল আলম ১১ মার্চ ১৯৪৮ তারিখে ‘বাংলা ভাষা দাবি দিবস’ ও ধর্মঘট পালিত হয়
জিন্নাহর রেসকোর্স ও কার্জন হল ভাষণ ২১ মার্চ ও ২৪ মার্চ ১৯৪৮ পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মুহম্মদ আলী জিন্নাহ ‘উর্দু এবং একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ ঘোষণায় ছাত্রদের ‘নো নো’ প্রতিবাদ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ১১ মার্চ ১৯৫০ আহ্বায়ক: আবদুল মতিন (‘ভাষা মতিন’) ভাষা আন্দোলনকে বেগবান করতে ছাত্রদের কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন
খাজা নাজিমুদ্দিনের পল্টন ময়দান ঘোষণা ২৭ জানুয়ারি ১৯৫২ পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন জিন্নাহর কথার পুনরাবৃত্তি করে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণায় চূড়ান্ত আন্দোলন শুরু
সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ (১৯৫২) ৩১ জানুয়ারি ১৯৫২ (বার লাইব্রেরি হল, ঢাকা) সভাপতি: মাওলানা ভাসানী, আহ্বায়ক: কাজী গোলাম মাহবুব ২১ ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী হরতাল, বিক্ষোভ ও মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা
১৪৪ ধারা জারি ও ভঙ্গের সিদ্ধান্ত ২০ ও ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ নূরুল আমিন সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে; ঢাবি আমতলা সভায় সভাপতিত্ব করেন গাজীউল হক আবদুস সামাদ আজাদের প্রস্তাবে ১০ জন করে খণ্ড খণ্ড মিছিল বের করার সিদ্ধান্ত
ভাষা শহীদ রফিকউদ্দিন আহমদ ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ জন্ম: পারিল গ্রাম (বর্তমান রফিকনগর), সিংগাইর, মানিকগঞ্জ ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের প্রথম শহীদ; মাথায় গুলিবিদ্ধ হন
ভাষা শহীদ আবুল বরকত ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের এমএ শ্রেণির ছাত্র জন্ম মুর্শিদাবাদের বাবলা গ্রামে; আজিমপুর কবরস্থানে সমাহিত
ভাষা শহীদ আবদুল জব্বার ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ জন্ম: পাঁচুয়া গ্রাম, গফরগাঁও, ময়মনসিংহ ক্যান্সার আক্রান্ত শাশুড়ির চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেলে এসে মিছিলে গুলিবিদ্ধ হন
ভাষা শহীদ শফিউর রহমান ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ ঢাকা হাইকোর্টের হিসাবরক্ষণ শাখার কর্মচারী নবাবপুর রোডে মিছিলে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন
ভাষা শহীদ আবদুস সালাম ৭ এপ্রিল ১৯৫২ (গুলিবিদ্ধ ২১ ফেব্রুয়ারি) জন্ম: লক্ষ্মণপুর (সালামনগর), দাগনভূঞা, ফেনী শিল্প ডিপার্টমেন্টের পিয়ন ছিলেন; চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন
প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণ ও উদ্বোধন ২৩ ও ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ নকশাকার: বদরুল আলম ও সাঈদ হায়দার; উদ্বোধন: শহীদ শফিউরের পিতা মৌলভী মাহবুবুর রহমান ২৬ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন ‘দৈনিক আজাদ’ সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দীন
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বর্তমান নকশা ১৯৫৭–১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দ স্থপতি হামিদুর রহমান ও ভাস্কর নভেরা আহমেদ ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৩ সালে উদ্বোধন করেন শহীদ বরকতের মাতা হাসিনা বেগম
‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ রচনা: ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ রচয়িতা: আবদুল গাফফার চৌধুরী; প্রথম সুরকার: আবদুল লতিফ; বর্তমান সুরকার: আলতাফ মাহমুদ হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ‘একুশে ফেব্রুয়ারী’ সংকলনে প্রথম প্রকাশিত
‘কবর’ নাটক ও ‘আরেক ফাল্গুন’ উপন্যাস ১৯৫৩ ও ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দ নাট্যকার: মুনীর চৌধুরী (ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রচিত); ঔপন্যাসিক: জহির রায়হান ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৩ সালে কারাবন্দি রণেশ দাশগুপ্তের অনুরোধে ‘কবর’ রচিত হয়
পাকিস্তানের প্রথম সংবিধানে বাংলার স্বীকৃতি ২৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৬ (কার্যকর ২৩ মার্চ ১৯৫৬) সংবিধানের ২১৪(১) অনুচ্ছেদে উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পূর্ব বাংলার নাম পরিবর্তন করে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ রাখা হয় (১৬ অক্টোবর ১৯৫৫)
কাগমারী সম্মেলন ৭–১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৭ (সন্তোষ, টাঙ্গাইল) মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের উদ্দেশ্যে ঐতিহাসিক ‘আসসালামু আলাইকুম’ (বিচ্ছেদের ইঙ্গিত) উচ্চারণ
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস স্বীকৃতি ১৭ নভেম্বর ১৯৯৯ (ইউনেস্কোর ৩০তম সাধারণ সম্মেলন) উদ্যোক্তা: কানাডা প্রবাসী রফিকুল ইসলাম ও আবদুস সালাম (‘মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ লাভার্স অব দ্য ওয়ার্ল্ড’) ২০০০ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে; ২০১০ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের স্বীকৃতি

📋 ১২. ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন — মূল পয়েন্ট ও তথ্য-সারসংক্ষেপ সারণি #

বিষয় / শিরোনাম / মূল এন্টিটি প্রধান তথ্য ও বিবরণ অতিরিক্ত বৈশিষ্ট্য ও প্রাসঙ্গিক তথ্য সিলেবাস অধ্যায় ও পরীক্ষার গুরুত্ব
পাকিস্তানের ভৌগোলিক অসামঞ্জস্য পূর্ব বাংলা (১৯৫৫ সালে নামকরণ করা হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান’) ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার ব্যবধান ছিল প্রায় ১,২০০ মাইল (প্রায় ২,০০০ কিলোমিটার) ভারতীয় ভূখণ্ড ১ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা ও পূর্ব বাংলার প্রতি বৈষম্যের স্বরূপ (১৯৪৭) সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ১২. ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন (পাকিস্তান আমল (১৯৪৭–১৯৭০))
২৭ জানুয়ারি ১৯৫২ পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দীন ঢাকার পল্টন ময়দানে ঘোষণা করেন, “পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু” এতে সমগ্র পূর্ব বাংলা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে ১২. ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন (পাকিস্তান আমল (১৯৪৭–১৯৭০))
৩০ জানুয়ারি ১৯৫২ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মঘট পালিত হয় ভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায় (১৯৫২) সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ১২. ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন (পাকিস্তান আমল (১৯৪৭–১৯৭০))
৩১ জানুয়ারি ১৯৫২ ঢাকা বার লাইব্রেরি হলে মাওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় কাজী গোলাম মাহবুবকে আহ্বায়ক করে ৪০ সদস্যবিশিষ্ট ‘সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয় সভায় ২১শে ফেব্রুয়ারি সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল ও ‘রাষ্ট্রভাষা দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় ১২. ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন (পাকিস্তান আমল (১৯৪৭–১৯৭০))
৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ ঢাকা শহরের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র ধর্মঘট ও বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয় ভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায় (১৯৫২) সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ১২. ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন (পাকিস্তান আমল (১৯৪৭–১৯৭০))
১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ কারাবন্দি শেখ মুজিবুর রহমান ও মহিউদ্দিন আহমেদকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ফরিদপুর কারাগারে স্থানান্তর করা হলে তাঁরা রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আমরণ অনশন শুরু করেন ভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায় (১৯৫২) সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ১২. ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন (পাকিস্তান আমল (১৯৪৭–১৯৭০))
২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ নূরুল আমিন সরকার ঢাকা শহরে ২০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা থেকে ১ মাসের জন্য ১৪৪ ধারা (সকল প্রকার মিছিল-সমাবেশ নিষিদ্ধ) জারি করে ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে ৯৪ নবাবপুর রোডে আবুল হাশিমের সভাপতিত্বে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের বৈঠকে সংখ্যাগরিষ্ঠ (১১-৪ ভোটে) সদস্য ১৪৪ ধারা না ভাঙার পক্ষে মত দিলেও আবদুল মতিন ও গাজীউল হকসহ ছাত্রনেতারা ১৪৪ ধারা ভাঙার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তে অটল থাকেন ১২. ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন (পাকিস্তান আমল (১৯৪৭–১৯৭০))
আবদুস সামাদের প্রস্তাব অনুযায়ী ১০ জন করে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে রাজপথে বের হওয়ার সিদ্ধান্ত হয় (ছাত্রীদের প্রথম দলটির নেতৃত্ব দেন শাফিয়া খাতুন, রওশন আরা বাচ্চু, হালিমা খাতুন ও সুফিয়া ইব্রাহিম) ভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায় (১৯৫২) সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ১২. ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন (পাকিস্তান আমল (১৯৪৭–১৯৭০))
প্রথম শহিদ মিনার ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা (নকশাকার: বদরুল আলম ও সাঈদ হায়দার) ১০/১১ ফুট উঁচু প্রথম শহিদ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেন শহিদ মিনার, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ১২. ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন (পাকিস্তান আমল (১৯৪৭–১৯৭০))
অনানুষ্ঠানিক উদ্বোধন ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সকালে শহিদ শফিউর রহমানের পিতা মৌলভী মাহবুবুর রহমান শহিদ মিনার, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ১২. ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন (পাকিস্তান আমল (১৯৪৭–১৯৭০))
আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সকালে দৈনিক আজাদ পত্রিকার সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দীন (২১ ফেব্রুয়ারি গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে তিনি প্রাদেশিক পরিষদ বা আইনসভার সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন) ২৬ ফেব্রুয়ারি বিকেলেই পুলিশ প্রথম শহিদ মিনারটি ভেঙে ফেলে ১২. ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন (পাকিস্তান আমল (১৯৪৭–১৯৭০))
বর্তমান কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার ১৯৫৭ সালে মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খানের আমলে এর কাজ শুরু হয় এবং ১৯৬৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি শহিদ বরকতের মাতা হাসিনা বেগম এর উদ্বোধন করেন এর স্থপতি চিত্রশিল্পী হামিদুর রহমান (সহযোগী ভাস্কর নভেরা আহমেদ) ১২. ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন (পাকিস্তান আমল (১৯৪৭–১৯৭০))
রাজশাহী কলেজের শহিদ মিনার ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ রাতেই রাজশাহী কলেজ প্রাঙ্গণে দেশের প্রথম দিকের একটি শহিদ মিনার নির্মিত হয়েছিল শহিদ মিনার, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ১২. ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন (পাকিস্তান আমল (১৯৪৭–১৯৭০))
দেশের সর্বোচ্চ শহিদ মিনার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থিত (উচ্চতা: ৭১ ফুট ভিত্তিপ্রস্তর ব্যাস ৫২ ফুট ১২. ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন (পাকিস্তান আমল (১৯৪৭–১৯৭০))
রাষ্ট্রভাষা হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি (১৯৫৬) ১৯৫৪ সালের ৭ মে পাকিস্তান গণপরিষদ বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং ২৩ মার্চ ১৯৫৬ কার্যকর হওয়া পাকিস্তানের প্রথম সংবিধানের ২১৪(১) অনুচ্ছেদে উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়া হয় শহিদ মিনার, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ১২. ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন (পাকিস্তান আমল (১৯৪৭–১৯৭০))
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি (১৯৯৯) কানাডার ভ্যাঙ্কুভার প্রবাসী দুই বাঙালি রফিকুল ইসলাম ও আবদুস সালাম কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ‘Mother Language Lovers of the World’ সংগঠনের উদ্যোগে এবং বাংলাদেশ সরকারের (তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী এ এস এইচ কে সাদেক) আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবে ১৭ নভেম্বর ১৯৯৯ ইউনেস্কোর (UNESCO) প্যারিসে অনুষ্ঠিত ৩০তম সাধারণ সম্মেলনে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ (International Mother Language Day) হিসেবে ঘোষণা করা হয় শহিদ মিনার, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ১২. ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন (পাকিস্তান আমল (১৯৪৭–১৯৭০))
২০০০ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি থেকে বিশ্বব্যাপী (১৮৮+ দেশে) দিবসটি পালিত হচ্ছে শহিদ মিনার, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ১২. ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন (পাকিস্তান আমল (১৯৪৭–১৯৭০))
৫ ডিসেম্বর ২০০৮ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদও ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয় শহিদ মিনার, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ১২. ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন (পাকিস্তান আমল (১৯৪৭–১৯৭০))
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট (IMLI) ঢাকার সেগুনবাগিচায় অবস্থিত (ভিত্তিপ্রস্তর ১৫ মার্চ ২০০১ — কফি আনান ও শেখ হাসিনা উদ্বোধন ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১০ ১২. ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন (পাকিস্তান আমল (১৯৪৭–১৯৭০))
তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা ১৯৪৮ সালের ২ মার্চ ফজলুল হক হলে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয় এবং ১১ মার্চ ১৯৪৮ ‘বাংলা ভাষা দাবি দিবস’ উপলক্ষে সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয় সেদিন শেখ মুজিবুর রহমানসহ অনেক নেতা গ্রেপ্তার হন ১২. ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন (পাকিস্তান আমল (১৯৪৭–১৯৭০))
তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা একুশের কালজয়ী এই গানটি রচনা করেন সাংবাদিক ও কলামিস্ট আবদুল গাফফার চৌধুরী গানটিতে প্রথম সুরারোপ করেন আবদুল লতিফ এবং পরবর্তীতে ১৯৫৪ সালে প্রচলিত হৃদয়স্পর্শী সুরটি প্রদান করেন শহিদ সুরকার আলতাফ মাহমুদ ১২. ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন (পাকিস্তান আমল (১৯৪৭–১৯৭০))
তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা ফ্রান্সের প্যারিসে অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর ৩০তম সাধারণ সম্মেলনে ১৭ নভেম্বর ১৯৯৯ তারিখে একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে বিশ্বব্যাপী এটি পালিত হচ্ছে 📝 টপিকভিত্তিক বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্নোত্তর অনুশীলন (টপিক ১২) সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ১২. ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন (পাকিস্তান আমল (১৯৪৭–১৯৭০))