টপিক 03 / ৫৮প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা📖 স্টাডি নোট
টপিক ০৩: পাল ও সেন রাজবংশ
অধ্যায় ০৩: পাল ও সেন রাজবংশ #
৩.১ পাল ও সেন রাজবংশের কালানুক্রম ও শাসন রূপরেখা #
৩.২ পাল রাজবংশ (৭৫০ – ১১৬১ খ্রি.) — বাংলার দীর্ঘস্থায়ী শাসন #
- শাসনকাল: প্রায় ৪০০ বছর (প্রাচীন বাংলায় সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী রাজবংশ)।
- ধর্ম: পাল রাজারা ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। তাঁদের পিতৃভূমি (‘জনকভূঃ’) ছিল বরেন্দ্র অঞ্চল।
| পাল শাসক | শাসনকাল | প্রধান কীর্তি, স্থাপত্য ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য |
|---|---|---|
| ১. গোপাল | ৭৫০–৭৮১ খ্রি. | পাল বংশের প্রতিষ্ঠাতা। মাৎস্যন্যায়ের অবসান ঘটাতে বাংলার প্রকৃতিপুঞ্জ বা প্রজাপ্রতিনিধিগণ (সামন্ত রাজারা) গোপালকে নির্বাচিত করেন। পিতা: বপ্যট (খান্ডিত/সৈনিক), পিতামহ: দয়িতবিষ্ণু (সর্ববিদ্যাবিশুদ্ধ)। তিনি নালন্দার কাছে ওদন্তপুরী বিহার নির্মাণ করেন। |
| ২. ধর্মপাল | ৭৮১–৮২১ খ্রি. | পাল বংশের শ্রেষ্ঠ সম্রাট। উপাধি: ‘পরমসৌগত’, ‘উত্তরাপথস্বামী’, মহারাজাধিরাজ। কনৌজের আধিপত্য নিয়ে ‘ত্রিশক্তির সংঘর্ষে’ (পাল, গুর্জর-প্রতিহার ও রাষ্ট্রকূট বংশ) লিপ্ত হন। নওগাঁর পাহাড়পুরে ‘সোমপুর মহাবিহার’ (ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য, ১৯৮৫), ভাগলপুরে ‘বিক্রমশীলা মহাবিহার’ ও ময়নামতিতে বিহারসহ মোট ৫০টি বৌদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। আরব বণিক সুলায়মান তাঁর রাজত্বকালে আসেন এবং পাল রাজ্যকে ‘রুহমী’ (Ruhmi) বলে উল্লেখ করেন। |
| ৩. দেবপাল | ৮২১–৮৬১ খ্রি. | ধর্মপালের পুত্র। উত্তর ভারতে পাল সাম্রাজ্যের সর্বাধিক বিস্তার ঘটান। রাজধানী ছিল মুঙ্গের। জাভা-সুমাত্রার শৈলেন্দ্রবংশীয় রাজা বালপুত্রদেবকে নালন্দায় একটি বৌদ্ধ মঠ নির্মাণের জন্য ৫টি গ্রাম দান করেন। বৌদ্ধ পণ্ডিত বীরদেবকে নালন্দা মহাবিহারের অধ্যক্ষ নিযুক্ত করেন। |
| ৪. প্রথম মহীপাল | ৯৯৫–১০৪৩ খ্রি. | ভেঙে পড়া পাল সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধার করেন (দ্বিতীয় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠাতা)। দিনাজপুরের বিখ্যাত ‘রামসাগর’ এর পাশাপাশি ‘মহীসাগর’ দীঘি এবং বগুড়ার মহীপুর ও মুর্শিদাবাদের মহীপাল নগরী তাঁর কীর্তি। তাঁর আমলে দক্ষিণ ভারতের চোলরাজ প্রথম রাজেন্দ্র চোল বাংলা আক্রমণ করেন এবং এই সময়েই অতীশ দীপঙ্কর তিব্বত গমন করেন। |
| ৫. দ্বিতীয় মহীপাল | ১০৭৫–১০৮০ খ্রি. | তাঁর দুঃশাসনের বিরুদ্ধে বরেন্দ্র অঞ্চলের কৈবর্ত নেতা দিব্য (দিব্যক) বিদ্রোহ করে বরেন্দ্র দখল করেন। একে ‘কৈবর্ত বিদ্রোহ’ বা ‘বরেন্দ্র বিদ্রোহ’ (১০৮০ খ্রি.) বলা হয়। কৈবর্ত রাজারা ছিলেন: দিব্য, রুদোক ও ভীম। |
| ৬. রামপাল | ১০৮২–১১২৪ খ্রি. | পাল বংশের সর্বশেষ সফল শাসক। কৈবর্ত রাজা ভীমকে পরাজিত করে বরেন্দ্র পুনরুদ্ধার করেন এবং নতুন রাজধানী ‘রামাবতী’ প্রতিষ্ঠা করেন। বরেন্দ্রতে ‘জগদ্দল মহাবিহার’ ও কৈবর্ত নেতা ভীমের স্মৃতিতে ‘ভীমের জাঙ্গাল’ নির্মিত হয়। সভাকবি সন্ধ্যাকর নন্দী তাঁর প্রশস্তি করে দ্ব্যর্থবোধক সংস্কৃত কাব্য ‘রামচরিতম্’ রচনা করেন। |
| ৭. মদনপাল | ১১৪৩–১১৬১ খ্রি. | পাল বংশের সর্বশেষ শাসক। তাঁর পর বিজয় সেন পালদের উচ্ছেদ করেন। |
পাল যুগের সাহিত্য ও শিল্পকলা:
- চর্যাপদ: বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদ পাল যুগেই রচিত হয় (৯ম–১২শ শতক; আবিষ্কারক হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, ১৯০৭ সালে নেপালের রাজদরবার থেকে)।
- ভাস্কর্য ও চিত্রকলা: পাল যুগের দুই বিখ্যাত ভাস্কর ও চিত্রশিল্পী ছিলেন ধীমান ও তাঁর পুত্র বীতপাল।
- চিকিৎসাশাস্ত্র: চক্রপাণি দত্ত (চিকিৎসাসংগ্রহ), সুরেশ্বর (শব্দপ্রদীপ) এবং পশুপালনবিদ হলায়ুধ।
৬. দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার ক্ষুদ্র স্বাধীন রাজবংশসমূহ (খড়্গ, দেব, কান্তিদেব, চন্দ্র ও বর্ম বংশ) #
| রাজবংশ | শাসনকাল ও অঞ্চল | প্রতিষ্ঠাতা, শ্রেষ্ঠ রাজা ও রাজধানী |
|---|---|---|
| ১. খড়্গ বংশ | ৭ম শতকের দ্বিতীয়ার্ধ (সমতট ও বঙ্গ) | প্রতিষ্ঠাতা: খড়্গোদ্যম। অন্যান্য রাজা: জাতখড়্গ, দেবখড়্গ (শ্রেষ্ঠ), রাজভট্ট। রাজধানী: কর্মামন্তবাসক (বড়কামতা, কুমিল্লা)। এরা ছিল বাংলার প্রথম বৌদ্ধ রাজবংশ। |
| ২. দেব বংশ | ৮ম শতক (সমতট অঞ্চল) | প্রতিষ্ঠাতা: শ্রীশান্তিদেব। অন্যান্য রাজা: বীরদেব, আনন্দদেব (কুমিল্লার ‘আনন্দ বিহার’ ও ‘ভোজ বিহার’ নির্মাতা), ভবদেব (শ্রেষ্ঠ রাজা; ময়নামতির ‘শালবন বিহার’ বা ভবদেব মহাবিহার নির্মাতা)। রাজধানী: দেবপর্বত (ময়নামতি)। |
| ৩. কান্তিদেবের রাজ্য | ৯ম শতক (হরিকেল ও চট্টগ্রাম) | রাজা: মহারাজাধিরাজ কান্তিদেব। রাজধানী: বর্ধমানপুর। (চট্টগ্রামে প্রাপ্ত অসমাপ্ত তাম্রশাসন থেকে জানা যায়)। |
| ৪. চন্দ্র বংশ | ১০ম–১১শ শতক (্রোহিতগিরি, বঙ্গ ও সমতট) | প্রতিষ্ঠাতা: পূর্ণচন্দ্র (প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা: ত্রৈলোক্যচন্দ্র)। শ্রেষ্ঠ রাজা: শ্রীচন্দ্র (প্রায় ৪৫ বছর শাসন করেন; রাজধানী দেবপর্বত থেকে বিক্রমপুরে স্থানান্তর করেন)। শেষ রাজা: গোবিন্দচন্দ্র। |
| ৫. বর্ম বংশ | ১১শ শতক (বঙ্গ ও বিক্রমপুর) | প্রতিষ্ঠাতা: জাতবর্মা (কলিঙ্গের সিংহপুর থেকে আগত)। রাজধানী: বিক্রমপুর। অন্যান্য রাজা: হরিবর্মা, সামলবর্মা, ভোজবর্মা (বেলাব তাম্রশাসন)। |
৭. সেন রাজবংশ (১০৭০ – ১২০৪ খ্রি.) #
- আদি নিবাস: দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক (মহীশূর)। সেনরা ছিল ‘ব্রহ্ম-ক্ষত্রিয়’ (প্রথমে ব্রাহ্মণ, পরে ক্ষত্রিয় বা যোদ্ধা পেশা গ্রহণকারী)। প্রথমে শৈব ও পরে বৈষ্ণব ধর্মের অনুসারী।
| সেন শাসক | শাসনকাল | প্রধান কীর্তি, গ্রন্থ ও ঐতিহাসিক ঘটনা |
|---|---|---|
| ১. সামন্ত সেন | ১১শ শতক | রাঢ় অঞ্চলে সেন বংশের গোড়াপত্তন করেন (তিনি রাজা উপাধি নেননি)। |
| ২. হেমন্ত সেন | ১০৭০–১০৯৭ খ্রি. | প্রথম ‘মহারাজাধিরাজ’ উপাধি ধারণ করেন; সেন বংশের আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠাতা। |
| ৩. বিজয় সেন | ১০৯৭–১১৬০ খ্রি. | সেন বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম সার্বভৌম রাজা। দীর্ঘ ৬২ বছর শাসন করেন। প্রথম রাজধানী হুগলির বিজয়পুর এবং দ্বিতীয় রাজধানী মুন্সীগঞ্জের বিক্রমপুর। দেওপাড়া প্রশস্তি (কবি উমাপতি ধর রচিত) তাঁর কীর্তি বহন করে। |
| ৪. বল্লাল সেন | ১১৬০–১১৭৯ খ্রি. | হিন্দু সমাজে আভিজাত্য প্রথা বা ‘কৌলীন্য প্রথা’ প্রবর্তন করেন। নিজে মহাপণ্ডিত ছিলেন; রচনা করেন ‘দানসাগর’ ও ‘অদ্ভুতসাগর’ (অসমাপ্ত গ্রন্থটি তাঁর পুত্র লক্ষ্মণ সেন সমাপ্ত করেন)। রাজধানী: রামপাল (বিক্রমপুর) ও গৌড়। কথিত আছে, তিনি বুড়িগঙ্গার তীরে ঢাকেশ্বরী মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। উপাধি: ‘অরিরাজ নিঃশঙ্ক শঙ্কর’। |
| ৫. লক্ষ্মণ সেন | ১১৭৯–১২০৬ খ্রি. | উপাধি: ‘অরিরাজ মদনশঙ্কর’ ও ‘পরমবৈষ্ণব’ (শৈব ধর্ম ত্যাগ করে বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করেন)। রাজধানী: নদীয়া (নবদ্বীপ), গৌড় (লক্ষ্মণাবতী) ও বিক্রমপুর। তাঁর রাজসভায় ‘পঞ্চরত্ন’ ছিলেন: ১. জয়দেব (গীতগোবিন্দম্), ২. ধোয়ী (পবনদূত), ৩. শরণ, ৪. গোবর্ধন (আর্যাসপ্তশতী) ও ৫. উমাপতি ধর। তাঁর প্রধানমন্ত্রী ছিলেন হলায়ুধ মিশ্র (ব্রাহ্মণসর্বস্ব রচয়িতা) এবং পণ্ডিত শ্রীধর দাস (সদুক্তিকর্ণামৃত সংকলক)। ১২০৪ খ্রিস্টাব্দে তুর্কি সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজি মাত্র ১৭/১৮ জন অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে নদীয়া আক্রমণ করলে লক্ষ্মণ সেন বিনা যুদ্ধে পেছনের দরজা দিয়ে নৌপথে পূর্ববঙ্গের বিক্রমপুরে পালিয়ে যান। |
| ৬. বিশ্বরূপ সেন ও কেশব সেন | ১২০৬–১২৩০ খ্রি. | লক্ষ্মণ সেনের মৃত্যুর পর তাঁর দুই পুত্র বিশ্বরূপ সেন ও কেশব সেন বিক্রমপুর থেকে ১২৩০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত পূর্ববঙ্গ শাসন করেন। সেন বংশের শেষ রাজা ছিলেন কেশব সেন। লক্ষ্মণ সেনের শাসনের অবসানের মধ্য দিয়ে বাংলায় প্রাচীন যুগের সমাপ্তি ও মধ্যযুগের (মুসলিম শাসন) সূচনা ঘটে। |
৮. বাংলায় আগমনকারী বিখ্যাত বিদেশি পরিব্রাজক / পর্যটক #
| পর্যটকের নাম | দেশ | কার শাসনামলে বাংলায়/ভারতে আসেন | রচিত গ্রন্থ ও গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য |
|---|---|---|---|
| মেগাস্থিনিস | গ্রিস | চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য (খ্রি.পূ. ৩০২) | ‘ইন্ডিকা’ (Indica); গঙ্গারিডাই রাজ্যের পরাক্রম বর্ণনা করেন। |
| ফা-হিয়েন (Fa-Hien) | চীন | দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত (৩৯৯–৪১৪ খ্রি.) | ‘ফো-কুয়ো-কি’; তাম্রলিপ্তি বন্দরে ২ বছর অবস্থান করে বৌদ্ধ পুঁথি কপি করেন। |
| হিউয়েন সাং (Hiuen Tsang) | চীন | হর্ষবর্ধন ও শশাঙ্ক (৬৩০–৬৪৩ খ্রি.) | ‘সি-ইউ-কি’; পুণ্ড্রবর্ধন (২০টি বিহার), সমতট (৩০টি বিহার), তাম্রলিপ্তি ও কর্ণসুবর্ণ ভ্রমণ করেন। তাঁকে ‘প্রিন্স অব পিলগ্রিমস’ বলা হয়। |
| ইৎ সিং (I-Tsing) | চীন | দেবখড়্গ (৬৭৩ খ্রি.) | তাম্রলিপ্তি ও নালন্দায় ১০ বছর অধ্যয়ন করেন; হরিকেলের বিবরণ দেন। |
| সুলায়মান | আরব | ধর্মপাল (৯ম শতক) | সিলসিলাত-উত-তাওয়ারিখ; পাল রাজ্যকে ‘রুহমী’ ও বাংলার সূক্ষ্ম সুতিবস্ত্রের প্রশংসা করেন। |
| ইবনে বতুতা | মরক্কো | দিল্লিতে মুহাম্মদ বিন তুঘলক ও বাংলায় ফখরুদ্দীন মুবারক শাহ (১৩৪৬ খ্রি.) | ‘কিতাবুল রিহলা’ (Rihla); চট্টগ্রাম (সদকাঁও) হয়ে সিলেটে হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর সাথে সাক্ষাৎ করেন। বাংলাকে ‘দোযখপুরী নিআমত’ (প্রাচুর্যপূর্ণ নরক) বলেন। |
| মা হুয়ান (Ma Huan) | চীন | গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ (১৪০৬ খ্রি.) | সোনারগাঁও ভ্রমণ করেন; বাংলার মসলিন ও রেশম শিল্পের ভূয়সী প্রশংসা করেন। |
| রালফ ফিচ (Ralph Fitch) | ইংল্যান্ড | সম্রাট আকবর ও ঈসা খাঁ (১৫৮৬ খ্রি.) | বাংলায় আগমনকারী প্রথম ইংরেজ পর্যটক; সোনারগাঁও ও চট্টগ্রাম ভ্রমণ করেন। |
| ফ্রাঁসোয়া বার্নিয়ের | ফ্রান্স | সম্রাট আওরঙ্গজেব ও শায়েস্তা খান (১৬৬৬ খ্রি.) | Travels in the Mughal Empire; বাংলাকে মিসরের চেয়েও সমৃদ্ধ দেশ বলেন। |
৩.৪ পাল ও সেন রাজবংশ — মাস্টার রেফারেন্স সারণি #
| ঐতিহাসিক বিষয় / শাসক / ঘটনা | সময়কাল / রাজধানী / স্থান | প্রধান কীর্তি / বৈশিষ্ট্য | ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও পরীক্ষার তথ্য |
|---|---|---|---|
| গোপাল (পাল বংশ) | রাজত্বকাল: ৭৫০–৭৭০ খ্রিস্টাব্দ | পাল বংশের প্রতিষ্ঠাতা (প্রকৃতিরাজ্য দ্বারা নির্বাচিত) | মাৎস্যন্যায়ের অবসান ঘটিয়ে ৪০০ বছরের পাল শাসন শুরু করেন |
| ধর্মপাল | রাজত্বকাল: ৭৭০–৮১০ খ্রিস্টাব্দ | পাল বংশের শ্রেষ্ঠ সম্রাট; উপাধি ‘পরম সৌগত’ | নওগাঁর পাহাড়পুরে সোমপুর মহাবিহার (৭৭০-৮১০) প্রতিষ্ঠা করেন |
| দেবপাল | রাজত্বকাল: ৮১০–৮৫০ খ্রিস্টাব্দ | মুঙ্গের ছিল তাঁর রাজধানী; বৌদ্ধ ধর্মের পৃষ্ঠপোষক | জাভার শৈলেন্দ্র বংশীয় রাজা বালপুত্রদেবকে নালন্দায় মঠ নির্মাণে ভূমিদান |
| মহীপাল (প্রথম) | রাজত্বকাল: ৯৮৮–১০৩৮ খ্রিস্টাব্দ | পাল সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচিত | চোল রাজা প্রথম রাজেন্দ্র চোলের আক্রমণ মোকাবিলা করেন |
| রামপাল | রাজত্বকাল: ১০৭৭–১১২০ খ্রিস্টাব্দ (রাজধানী: রামাবতী) | পাল বংশের সর্বশেষ সফল শাসক | বরেন্দ্র বিদ্রোহ দমন করে পিতৃভূমি উদ্ধার করেন |
| কৈবর্ত বিদ্রোহ (দিব্য) | একাদশ শতাব্দীর শেষভাগ (১০৭০–১০৮২ খ্রি.) | বাংলার ইতিহাসে প্রথম সফল বিদ্রোহ | নেতা ছিলেন দিব্য (দিব্যোক), রুদোক ও ভীম |
| বিজয় সেন | রাজত্বকাল: ১০৯৮–১১৬০ খ্রিস্টাব্দ | সেন বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা (আদি পুরুষ সামন্ত সেন) | বারাকপুর তাম্রশাসন ও দেওপাড়া প্রশস্তি তাঁর আমলের |
| বল্লাল সেন | রাজত্বকাল: ১১৬০–১১৭৮ খ্রিস্টাব্দ | হিন্দু সমাজে ‘কৌলীন্য প্রথা’ প্রবর্তন করেন | রচিত গ্রন্থ: ‘দানসাগর’ ও ‘অদ্ভুতসাগর’ (অসমাপ্ত) |
| লক্ষ্মণ সেন | রাজত্বকাল: ১১৭৮–১২০৫ খ্রিস্টাব্দ (রাজধানী: নদীয়া ও বিক্রমপুর) | সেন বংশের শেষ সার্বভৌম রাজা; উপাধি ‘গৌড়েশ্বর’ | সভার কবি ছিলেন জয়দেব (‘গীতগোবিন্দম্’), হলায়ুধ মিশ্র ও ধোয়ী |
৩.৩ শাসন কাঠামো, সমাজব্যবস্থা ও সাহিত্য-স্থাপত্যের প্রামাণ্য বিশ্লেষণ #
- গোপালের নির্বাচন ও মাৎস্যন্যায়ের অবসান: প্রায় ১০০ বছরের অরাজক মাৎস্যন্যায় (৬৫০–৭৫০ খ্রি.) দূর করতে বাংলার প্রকৃতিপুঞ্জ/প্রধানগণ ৭ dona/৭৫৬ খ্রিস্টাব্দে গোপালকে রাজপদে বরণ করেন। খালিমপুর তাম্রশাসন অনুসারে গোপাল ছিলেন সর্বসম্মত নির্বাচিত নৃপতি।
- ধর্মপালের কীর্তি: পাল বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক ধর্মপাল (৭৮১–৮২১ খ্রি.)। নওগাঁ জেলার পাহাড়পুরে সুবিখ্যাত ‘সোমপুর মহাবিহার’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়। তিনি বিহারে বিক্রমশীলা বিহার প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর উপাধি ছিল ‘পরমসৌগত’ ও ‘উত্তরাপথস্বামিন’।
- দেবপাল ও রামপাল: দেবপালের সময় পাল সাম্রাজ্যের সীমানা সর্বাধিক বিস্তৃত হয় এবং সুমাত্রার শৈলেন্দ্র রাজপুত্র বালপুত্রদেবের অনুরোধে নালন্দা মহাবিহারে ৫টি গ্রাম দান করেন। রামপালের আমলে উত্তরবঙ্গে দিব্যক ও ভীমের নেতৃত্বে কৈবর্ত বিদ্রোহ সংঘটিত হয়; কবি সন্ধ্যাকর নন্দী রামপালের জীবনী নিয়ে রচনা করেন ‘রামচরিতম্’।
- সেন রাজাদের শাসন ও সাহিত্য: সেনরা ছিলেন দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক থেকে আগত ‘ব্রহ্মক্ষত্রিয়’। লক্ষণ সেনের পঞ্চরত্ন সভা অলঙ্কৃত করতেন: জয়দেব (গীতগোবিন্দম্), ধোয়ী (পবনদূত), শরণ, গোবর্ধন ও উমাপতিধর। লক্ষণ সেনের আমলে তুর্কি সেনাপতি বখতিয়ার খলজি নদীয়া আক্রমণ করেন (১২০৪ খ্রি.) এবং লক্ষণ সেন দ্বিতীয় রাজধানী বিক্রমপুরে আশ্রয় নেন।