টপিক 04 / ৫৮প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা📖 স্টাডি নোট
টপিক ০৪: মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা ও সুলতানি আমল
অধ্যায় ০৪: মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা ও সুলতানি আমল #
উপমহাদেশে মুসলিম শাসনের পটভূমি #
- আরবদের সিন্ধু বিজয় (৭১২ খ্রি.): ইরাকের শাসনকর্তা হাজ্জাজ বিন ইউসুফের নির্দেশে ১৭ বছর বয়সী সেনাপতি মুহাম্মদ বিন কাসিম সিন্ধুর রাজা দাহিরকে পরাজিত করে উপমহাদেশে প্রথম মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা করেন।
- সুলতান মাহমুদ (গজনী): ১০০০ থেকে ১০২৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ১৭ বার ভারত আক্রমণ করেন (১০২৬ খ্রিস্টাব্দে গুজরাটের বিখ্যাত সোমনাথ মন্দির আক্রমণ)। তাঁর সভাকবি ছিলেন মহাকবি ফেরদৌসী (শাহনামা রচয়িতা — ৬০,০০০ শ্লোক) এবং সাথে ভারতে আসেন বিশ্বখ্যাত পণ্ডিত আল-বেরুনী (কিতাবুল হিন্দ রচয়িতা)।
- মুহাম্মদ ঘুরী ও তরাইনের যুদ্ধ:
- তরাইনের প্রথম যুদ্ধ (১১৯১ খ্রি.): চৌহান রাজা পৃথ্বীরাজ চৌহানের কাছে মুহাম্মদ ঘুরী পরাজিত হন।
- তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধ (১১৯২ খ্রি.): মুহাম্মদ ঘুরী পৃথ্বীরাজ চৌহানকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করে ভারতে স্থায়ী মুসলিম সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করেন।
- দিল্লি সালতানাত (১২০৬ – ১৫২৬ খ্রি.):
- দাস বংশ (১২০৬–১২৯০): প্রতিষ্ঠাতা কুতুবউদ্দিন আইবেক (কুতুব মিনার নির্মাতা; দানশীলতার জন্য উপাধি ‘লাখবখশ’; পোলো খেলতে গিয়ে ঘোড়া থেকে পড়ে মৃত্যু)। প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা শামসউদ্দিন ইলতুৎমিশ (বাগদাদের খলিফা থেকে ‘সুলতান-ই-আজম’ উপাধি লাভ)। তাঁর কন্যা সুলতানা রাজিয়া ছিলেন দিল্লির সিংহাসনে আরোহণকারী প্রথম ও একমাত্র মুসলিম নারী শাসক (১২৩৬–১২৪০)। গিয়াসউদ্দিন বলবন (‘রক্ত ও লৌহ নীতি’ প্রবর্তক)।
- খলজি বংশ (১২৯০–১৩২০): প্রতিষ্ঠাতা জালালউদ্দিন খলজি; শ্রেষ্ঠ শাসক আলাউদ্দিন খলজি (দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও রেশনিং প্রথা প্রবর্তক; সভাকবি আমির খসরু — ‘ভারতের তোতাপাখি’)।
- তুঘলক বংশ (১৩২০–১৪১৪): প্রতিষ্ঠাতা গিয়াসউদ্দিন তুঘলক। মুহাম্মদ বিন তুঘলক (দিল্লি থেকে দেবগিরি/দৌলতাবাদে রাজধানী স্থানান্তর ও তামার মুদ্রা প্রচলন; ইতিহাসে ‘পাগলা রাজা’ বা ‘বিপরীত গুণের সংমিশ্রণ’)। ফিরোজ শাহ তুঘলক (সেচ খাল ও জৌনপুর শহর নির্মাতা)। ১৩৯৮ খ্রিস্টাব্দে তৈমুর লং দিল্লি আক্রমণ করেন।
- সৈয়দ বংশ (১৪১৪–১৪৫১) ও লোদী বংশ (১৪৫১–১৫২৬): লোদী বংশের শেষ সুলতান ইব্রাহিম লোদীকে ১৫২৬ সালে পানিপথের প্রথম যুদ্ধে বাবর পরাজিত করেন।
বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা: বখতিয়ার খলজি (১২০৪ খ্রি.) #
- পূর্ণ নাম: ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি (জন্ম: আফগানিস্তানের গরমশির বা দশত-ই-মার্গ; জাতিতে তুর্কি এবং বংশে খলজি)।
- নদীয়া বিজয় (১২০৪ খ্রি.): ঝাড়খণ্ডের দুর্গম জঙ্গল পথ অতিক্রম করে অশ্ববিক্রেতার ছদ্মবেশে মাত্র ১৭/১৮ জন অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে লক্ষ্মণ সেনের রাজধানী নদীয়া জয় করেন।
- রাজধানী: নদীয়া ত্যাগ করে গৌড় বা লখনৌতিতে (লক্ষ্মণাবতী) রাজধানী স্থাপন করেন, পরে দেবকোটে স্থানান্তর করেন।
- তিব্বত অভিযান ও মৃত্যু: ১২০৫ খ্রিস্টাব্দে তিব্বত অভিযান ব্যর্থ হয় এবং ১২০৬ খ্রিস্টাব্দে দেবকোটে শয্যাশায়ী অবস্থায় তাঁর আমির আলী মর্দান খলজির হাতে নিহত হন। ঐতিহাসিক মিনহাজ-ই-সিরাজ তাঁর ‘তবকাত-ই-নাসিরী’ গ্রন্থে বখতিয়ার খলজির বাংলা বিজয়ের বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন।
বাংলায় স্বাধীন সুলতানি আমল (১৩৩৮ – ১৫৩৮ খ্রি. : ২০০ বছর) #
৪.২ স্বাধীন সুলতানদের বিস্তারিত কীর্তি ও শাসন ইতিবৃত্ত #
ফখরুদ্দীন মুবারক শাহ (১৩৩৮–১৩৪৯ খ্রি.):
- বাংলায় স্বাধীন সুলতানি শাসনের প্রতিষ্ঠাতা। দিল্লির সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে সোনারগাঁওয়ে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।
- প্রথম মুসলিম শাসক হিসেবে চট্টগ্রাম জয় করেন এবং চাঁদপুর থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত রাজপথ ও মসজিদ নির্মাণ করেন।
- তাঁর আমলে ১৩৪৬ খ্রিস্টাব্দে মরক্কোর পর্যটক ইবনে বতুতা বাংলায় আসেন এবং সিলেটে হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর সাথে সাক্ষাৎ করেন।
শামসউদ্দিন ইলিয়াস শাহ (১৩৪২–১৩৫৮ খ্রি.):
- ইলিয়াস শাহী বংশের প্রতিষ্ঠাতা। ১৩৫২ খ্রিস্টাব্দে লখনৌতি, সাতগাঁও ও সোনারগাঁও একত্রিত করে সমগ্র বাংলাকে একক শাসনাধীনে আনেন।
- এজন্য তিনি ‘শাহ-ই-বাঙ্গালাহ’, ‘শাহ-ই-বাঙালিয়ান’ ও ‘সুলতান-ই-বাঙ্গালাহ’ উপাধি ধারণ করেন। তাঁর আমল থেকেই এই ভূখণ্ড আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বাঙ্গালাহ’ (বাংলা) নামে পরিচিত হয়।
- রাজধানী স্থাপন করেন হযরত পাণ্ডুয়ায় (ফিরোজাবাদ)। দিল্লির সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক একডালা দুর্গ অবরোধ করেও তাঁকে পরাজিত করতে পারেননি।
সিকান্দার শাহ (১৩৫৮–১৩৯৩ খ্রি.): ইলিয়াস শাহের পুত্র। পাণ্ডুয়ায় ভারতের অন্যতম বৃহত্তম ‘আদিনা মসজিদ’ (১৩৬৯ খ্রি.) নির্মাণ করেন।
গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ (১৩৯৩–১৪১০ খ্রি.):
- ইলিয়াস শাহী বংশের শ্রেষ্ঠ সুলতান। ন্যায়বিচারের জন্য প্রসিদ্ধ (কাজী সিরাজউদ্দিনের আদালতে সুলতানের বিচারের কাহিনী)।
- ইরানের মহাকবি হাফিজের সাথে তাঁর পত্রালাপ ছিল (তাকে বাংলায় আসার আমন্ত্রণ জানান, উত্তরে হাফিজ গজল পাঠান)।
- তাঁর রাজত্বকালে কৃত্তিবাস ওঝা বাংলায় ‘শ্রীরাম পাঁচালী’ (রামায়ণ) অনুবাদ করেন এবং শাহ মুহম্মদ সগীর বাংলা সাহিত্যের প্রথম মুসলিম প্রণয়োপাখ্যান ‘ইউসুফ-জুলেখা’ রচনা করেন।
- তাঁর সমাধি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের মোগড়াপাড়ায় অবস্থিত।
রাজা গণেশ ও জালালউদ্দিন মুহাম্মদ শাহ (১৪১৫–১৪৩৩ খ্রি.):
- ভাতুরিয়ার জমিদার রাজা গণেশের পুত্র যদু ইসলাম গ্রহণ করে জালালউদ্দিন মুহাম্মদ শাহ নাম নিয়ে সিংহাসনে বসেন। তিনি রাজধানী পাণ্ডুয়া থেকে পুনরায় গৌড়ে স্থানান্তর করেন।
রুকনউদ্দিন বারবক শাহ (১৪৫৯–১৪৭৪ খ্রি.):
- মালাধর বসু তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় ভাগবতের বাংলা অনুবাদ ‘শ্রীকৃষ্ণবিজয়’ রচনা করেন এবং সুলতানের কাছ থেকে ‘গুণরাজ খান’ উপাধি লাভ করেন।
- বাগেরহাটে হযরত খান জাহান আলী (রহ.) ‘ষাট গম্বুজ মসজিদ’ (গম্বুজ ৮১টি, স্তম্ভ ৬০টি; ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য ১৯৮৫) নির্মাণ করেন।
আলাউদ্দিন হোসেন শাহ (১৪৯৩–১৫১৯ খ্রি.) — মধ্যযুগের স্বর্ণযুগ:
- হাবশী শাসনের অবসান ঘটিয়ে হোসেন শাহী বংশ প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল সৈয়দ হোসেন।
- অসাম্প্রদায়িক নীতি, শিল্প-সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতা ও শান্তির জন্য তাঁকে ‘বাংলার আকবর’, ‘নৃপতি তিলক’, ‘জগৎভূষণ’ ও ‘কৃষ্ণ অবতার’ বলা হতো। তাঁর শাসনকালকে বাংলার স্বাধীন সুলতানি আমলের স্বর্ণযুগ বলা হয়।
- রাজধানী ছিল একডালা। গৌড়ের ‘ছোট সোনা মসজিদ’ (ওয়ালী মুহাম্মদ নির্মিত) তাঁর আমলে নির্মিত হয়।
- তাঁর সমসাময়িক ছিলেন বৈষ্ণব ধর্মের প্রবর্তক শ্রীচৈতন্যদেব। তাঁর সেনাপতি পরাগল খান ও পুত্র ছুটি খানের পৃষ্ঠপোষকতায় কবীন্দ্র পরমেশ্বর ও শ্রীকর নন্দী মহাভারতের বাংলা অনুবাদ করেন এবং বিজয় গুপ্ত ‘মনসামঙ্গল’ রচনা করেন।
নাসিরউদ্দিন নুসরত শাহ (১৫১৯–১৫৩২ খ্রি.): গৌড়ের ‘বড় সোনা মসজিদ’ ও ‘কদম রসুল’ ভবন নির্মাণ করেন। বাবরের সাথে সন্ধি করে বাংলার স্বাধীনতা রক্ষা করেন।
গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহ (১৫৩৩–১৫৩৮ খ্রি.): বাংলার সর্বশেষ স্বাধীন সুলতান। ১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দে আফগান শাসক শেরশাহ শূর গৌড় দখল করলে বাংলায় ২০০ বছরের স্বাধীন সুলতানি যুগের অবসান ঘটে।
৪.৩ মুসলিম শাসন ও সুলতানি আমল — মাস্টার রেফারেন্স সারণি #
| ঐতিহাসিক বিষয় / শাসক / ঘটনা | সময়কাল / রাজধানী / স্থান | প্রধান কীর্তি / বৈশিষ্ট্য | ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও পরীক্ষার তথ্য |
|---|---|---|---|
| ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজি | ১২০৪ খ্রিস্টাব্দ (নদীয়া বিজয়) | বাংলায় মুসলিম শাসনের প্রতিষ্ঠাতা (লক্ষণাবতী রাজধানী) | মাত্র ১৭-১৮ জন অশ্বারোহী নিয়ে লক্ষ্মণ সেনকে পরাজিত করেন |
| ফখরুদ্দীন মুবারক শাহ | রাজত্বকাল: ১৩৩৮–১৩৪৯ খ্রিস্টাব্দ (রাজধানী: সোনারগাঁও) | বাংলায় স্বাধীন সুলতানি আমলের সূচনাকারী | চট্টগ্রাম জয় করেন এবং চাঁদপুর থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত রাজপথ নির্মাণ করেন |
| শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ | রাজত্বকাল: ১৩৪২–১৩৫৮ খ্রিস্টাব্দ (রাজধানী: পান্ডুয়া) | সমগ্র বাংলা একত্রিত করে ‘শাহ-ই-বাঙ্গালাহ’ ও ‘শাহ-ই-বাঙালিয়ান’ উপাধি গ্রহণ | বাঙালি জাতীয়তাবাদের আদি পৃষ্ঠপোষক; হাজী ইলিয়াস নামে পরিচিত |
| সিকান্দার শাহ | রাজত্বকাল: ১৩৫৮–১৩৯৩ খ্রিস্টাব্দ | পান্ডুয়ায় বিখ্যাত ‘আদিনা মসজিদ’ নির্মাণ করেন | দিল্লির সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলকের আক্রমণ প্রতিহত করেন |
| গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ | রাজত্বকাল: ১৩৯৩–১৪১০ খ্রিস্টাব্দ | পারস্যের কবি হাফিজের সাথে পত্রালাপ করেছিলেন | তাঁর আমলে শাহ মুহম্মদ সগীর ‘ইউসুফ-জুলেখা’ কাব্য রচনা করেন |
| আলাউদ্দিন হোসেন শাহ | রাজত্বকাল: ১৪৯৩–১৫১৯ খ্রিস্টাব্দ | সুলতানি বাংলার ‘স্বর্ণযুগ’ (হোসেন শাহী বংশের প্রতিষ্ঠাতা) | উপাধি ‘নৃপতি তিলক’ ও ‘জগতভূষণ’; ছোট সোনা মসজিদ তাঁর আমলে নির্মিত |
| শের শাহ সুরি | রাজত্বকাল: ১৫৪০–১৫৪৫ খ্রিস্টাব্দ | সোনারগাঁও থেকে সিন্ধুনদ পর্যন্ত ‘গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড’ নির্মাণ | ঘোড়ার ডাকের প্রচলন, রৌপ্যমুদ্রা ‘দাম’ ও ‘রুপি’ এবং কবুলিয়ত-পাট্টা প্রবর্তন |
৪.৪ সুলতানি যুগের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক তথ্য ও রিভিশন ছক #
| বিষয় / ব্যক্তিত্ব / প্রতিষ্ঠান ও সময়কাল | প্রধান পরিচয় / অবস্থান / আইন | মূল কীর্তি / বৈশিষ্ট্য ও কাঠামো | বিসিএস ও সরকারি চাকরি পরীক্ষার বিশেষ তথ্য |
|---|---|---|---|
| বখতিয়ার খলজির নদীয়া বিজয় (১২০৪ খ্রি.) | তুর্কি বীর ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজি | মাত্র ১৭–১৮ জন অশ্বারোহী নিয়ে রাজা লক্ষ্মণ সেনকে পরাজিত করেন | গৌড়/লক্ষণাবতীতে রাজধানী স্থাপন; দিনাজপুরের দেবকোটে সমাহিত (১২০৬) |
| গিয়াসউদ্দিন ইওয়াজ খলজি (১২১২–১২২৭ খ্রি.) | লখনৌতির স্বাধীনচেতা খলজি শাসক | বাংলায় প্রথম নৌবাহিনী গঠন ও দুর্গ নির্মাণ করেন | সুলতান ইলতুৎমিশের পুত্র নাসিরউদ্দিন মাহমুদের হাতে পরাজিত |
| শামসুদ্দীন ফিরোজ শাহ (১৩০১–১৩২২ খ্রি.) | লখনৌতির সুলতান (হযরত শাহজালাল রহ.-এর সমসাময়িক) | ১৩০৩ সালে রাজা গৌরগোবিন্দকে পরাজিত করে সিলেট বিজয় | সিকেট বিজয়ে সেনাপতি ছিলেন সিকান্দার খান গাজী ও সৈয়দ নাসিরউদ্দিন |
| ফখরুদ্দীন মুবারক শাহ (১৩৩৮–১৩৪৯ খ্রি.) | বাংলায় স্বাধীন সুলতানি আমলের প্রতিষ্ঠাতা | রাজধানী ছিল নারায়ণগঞ্জের ‘সোনারগাঁও’ | ১৩৪০ সালে চট্টগ্রাম জয় ও চাঁদপুর-চট্টগ্রাম রাজপথ নির্মাণ; ইবনে বতুতার আগমন (১৩৪৬) |
| শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ (১৩৪২–১৩৫৮ খ্রি.) | ইলিয়াস শাহী বংশের প্রতিষ্ঠাতা (রাজধানী: পান্ডুয়া) | সমগ্র বাংলা একত্রিত করে ‘শাহ-ই-বাঙ্গালাহ’ ও ‘শাহ-ই-বাঙালিয়ান’ উপাধি গ্রহণ | ১৩৫২ সালে সোনারগাঁও জয় করে অখণ্ড বাংলা গঠন করেন |
| সিকান্দার শাহ (১৩৫৮–১৩৯৩ খ্রি.) | ইলিয়াস শাহের সুযোগ্য পুত্র ও উত্তরাধিকারী | ১৩৬৯ সালে পান্ডুয়ায় বিখ্যাত ‘আদিনা মসজিদ’ (উপমহাদেশের বৃহত্তম) নির্মাণ | দিল্লির সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলকের আক্রমণ প্রতিহত করেন |
| গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ (১৩৯৩–১৪১০ খ্রি.) | ইলিয়াস শাহী বংশের শ্রেষ্ঠ ও ন্যায়পরায়ণ সুলতান | পারস্যের মহাকবি হাফিজকে বাংলায় আসার আমন্ত্রণ জানান | তাঁর আমলে শাহ মুহম্মদ সগীর ‘ইউসুফ-জুলেখা’ ও কৃত্তিবাস ‘রামায়ণ’ অনুবাদ করেন |
| রাজা গণেশ ও জালালউদ্দিন মুহম্মদ শাহ (১৪১৪–১৪৩৩) | ভাতুরিয়ার জমিদার রাজা গণেশের পুত্র যদু ইসলাম গ্রহণ করে জালালউদ্দিন নাম নেন | রাজধানী পান্ডুয়া থেকে গৌড়ে স্থানান্তর করেন | বাগেরহাটে খান জাহান আলী (রহ.) ষাটগম্বুজ মসজিদ ও দীঘি নির্মাণ করেন |
| রুকনউদ্দিন বারবক শাহ (১৪৫৯–১৪৭৪ খ্রি.) | পরবর্তী ইলিয়াস শাহী বংশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সুলতান | মালাধর বসুকে (‘শ্রীকৃষ্ণবিজয়’ রচয়িতা) ‘গুণরাজ খান’ উপাধি প্রদান | কৃত্তিবাস ওঝা ও বृहস্পতি মিশ্রকে পৃষ্ঠপোষকতা দান |
| আলাউদ্দিন হোসেন শাহ (১৪৯৩–১৫১৯ খ্রি.) | হোসেন শাহী বংশের প্রতিষ্ঠাতা; মধ্যযুগের বাংলার ‘স্বর্ণযুগ’ | উপাধি: ‘নৃপতি তিলক’, ‘জগতভূষণ’ ও ‘কৃষ্ণ অবতার’ | ছোট সোনা মসজিদ নির্মাণ; শ্রীচৈতন্যদেবের বৈষ্ণব আন্দোলনে সহনশীলতা |
| নুসরত শাহ (১৫১৯–১৫৩২ খ্রি.) | হোসেন শাহের জ্যেষ্ঠ পুত্র ও শিল্পানুরাগী সুলতান | গৌড়ের ‘বড় সোনা মসজিদ’ (বারোদুয়ারী) ও ‘কদম রসুল’ নির্মাণ | পরাগল খান ও ছুটি খানের পৃষ্ঠপোষকতায় মহাভারত বাংলায় অনূদিত হয় |
| গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহ (১৫৩৩–১৫৩৮ খ্রি.) | হোসেন শাহী বংশের তথা স্বাধীন সুলতানি আমলের শেষ সুলতান | ১৫৩৮ সালে শের খানের (শের শাহ) গৌড় অধিকারের মাধ্যমে ২০০ বছরের স্বাধীন সুলতানি আমলের অবসান | তাঁর আমলে পর্তুগিজরা চট্টগ্রাম ও সপ্তগ্রামে বাণিজ্যের অনুমতি পায় |
📋 ০৪. মুসলিম শাসন ও সুলতানি আমল — মূল পয়েন্ট ও তথ্য-সারসংক্ষেপ সারণি #
| বিষয় / শিরোনাম / মূল এন্টিটি | প্রধান তথ্য ও বিবরণ | অতিরিক্ত বৈশিষ্ট্য ও প্রাসঙ্গিক তথ্য | সিলেবাস অধ্যায় ও পরীক্ষার গুরুত্ব |
|---|---|---|---|
| আরবদের সিন্ধু বিজয় (৭১২ খ্রি.) | ইরাকের শাসনকর্তা হাজ্জাজ বিন ইউসুফের নির্দেশে ১৭ বছর বয়সী সেনাপতি মুহাম্মদ বিন কাসিম সিন্ধুর রাজা দাহিরকে পরাজিত করে উপমহাদেশে প্রথম মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা করেন | উপমহাদেশে মুসলিম শাসনের পটভূমি সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য | ০৪. মুসলিম শাসন ও সুলতানি আমল (প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা) |
| সুলতান মাহমুদ (গজনী) | ১০০০ থেকে ১০২৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ১৭ বার ভারত আক্রমণ করেন (১০২৬ খ্রিস্টাব্দে গুজরাটের বিখ্যাত সোমনাথ মন্দির আক্রমণ) | তাঁর সভাকবি ছিলেন মহাকবি ফেরদৌসী (শাহনামা রচয়িতা — ৬০,০০০ শ্লোক) এবং সাথে ভারতে আসেন বিশ্বখ্যাত পণ্ডিত আল-বেরুনী (কিতাবুল হিন্দ রচয়িতা) | ০৪. মুসলিম শাসন ও সুলতানি আমল (প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা) |
| তরাইনের প্রথম যুদ্ধ (১১৯১ খ্রি.) | চৌহান রাজা পৃথ্বীরাজ চৌহানের কাছে মুহাম্মদ ঘুরী পরাজিত হন | উপমহাদেশে মুসলিম শাসনের পটভূমি সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য | ০৪. মুসলিম শাসন ও সুলতানি আমল (প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা) |
| তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধ (১১৯২ খ্রি.) | মুহাম্মদ ঘুরী পৃথ্বীরাজ চৌহানকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করে ভারতে স্থায়ী মুসলিম সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করেন | উপমহাদেশে মুসলিম শাসনের পটভূমি সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য | ০৪. মুসলিম শাসন ও সুলতানি আমল (প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা) |
| দাস বংশ (১২০৬–১২৯০) | প্রতিষ্ঠাতা কুতুবউদ্দিন আইবেক (কুতুব মিনার নির্মাতা | দানশীলতার জন্য উপাধি ‘লাখবখশ’ | ০৪. মুসলিম শাসন ও সুলতানি আমল (প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা) |
| খলজি বংশ (১২৯০–১৩২০) | প্রতিষ্ঠাতা জালালউদ্দিন খলজি | শ্রেষ্ঠ শাসক আলাউদ্দিন খলজি (দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও রেশনিং প্রথা প্রবর্তক | ০৪. মুসলিম শাসন ও সুলতানি আমল (প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা) |
| তুঘলক বংশ (১৩২০–১৪১৪) | প্রতিষ্ঠাতা গিয়াসউদ্দিন তুঘলক | মুহাম্মদ বিন তুঘলক (দিল্লি থেকে দেবগিরি/দৌলতাবাদে রাজধানী স্থানান্তর ও তামার মুদ্রা প্রচলন | ০৪. মুসলিম শাসন ও সুলতানি আমল (প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা) |
| সৈয়দ বংশ (১৪১৪–১৪৫১) | ও লোদী বংশ (১৪৫১–১৫২৬): লোদী বংশের শেষ সুলতান ইব্রাহিম লোদীকে ১৫২৬ সালে পানিপথের প্রথম যুদ্ধে বাবর পরাজিত করেন | উপমহাদেশে মুসলিম শাসনের পটভূমি সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য | ০৪. মুসলিম শাসন ও সুলতানি আমল (প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা) |
| পূর্ণ নাম | ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি (জন্ম: আফগানিস্তানের গরমশির বা দশত-ই-মার্গ | জাতিতে তুর্কি এবং বংশে খলজি) | ০৪. মুসলিম শাসন ও সুলতানি আমল (প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা) |
| নদীয়া বিজয় (১২০৪ খ্রি.) | ঝাড়খণ্ডের দুর্গম জঙ্গল পথ অতিক্রম করে অশ্ববিক্রেতার ছদ্মবেশে মাত্র ১৭/১৮ জন অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে লক্ষ্মণ সেনের রাজধানী নদীয়া জয় করেন | বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা: বখতিয়ার খলজি (১২০৪ খ্রি.) সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য | ০৪. মুসলিম শাসন ও সুলতানি আমল (প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা) |
| রাজধানী | নদীয়া ত্যাগ করে গৌড় বা লখনৌতিতে (লক্ষ্মণাবতী) রাজধানী স্থাপন করেন, পরে দেবকোটে স্থানান্তর করেন | বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা: বখতিয়ার খলজি (১২০৪ খ্রি.) সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য | ০৪. মুসলিম শাসন ও সুলতানি আমল (প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা) |
| তিব্বত অভিযান ও মৃত্যু | ১২০৫ খ্রিস্টাব্দে তিব্বত অভিযান ব্যর্থ হয় এবং ১২০৬ খ্রিস্টাব্দে দেবকোটে শয্যাশায়ী অবস্থায় তাঁর আমির আলী মর্দান খলজির হাতে নিহত হন | ঐতিহাসিক মিনহাজ-ই-সিরাজ তাঁর ‘তবকাত-ই-নাসিরী’ গ্রন্থে বখতিয়ার খলজির বাংলা বিজয়ের বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন | ০৪. মুসলিম শাসন ও সুলতানি আমল (প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা) |
| বাংলায় স্বাধীন সুলতানি শাসনের প্রতিষ্ঠাতা | দিল্লির সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে সোনারগাঁওয়ে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন | বাংলায় স্বাধীন সুলতানি আমল (১৩৩৮ – ১৫৩৮ খ্রি. : ২০০ বছর) সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য | ০৪. মুসলিম শাসন ও সুলতানি আমল (প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা) |
| ইলিয়াস শাহী বংশের প্রতিষ্ঠাতা | ১৩৫২ খ্রিস্টাব্দে লখনৌতি, সাতগাঁও ও সোনারগাঁও একত্রিত করে সমগ্র বাংলাকে একক শাসনাধীনে আনেন | বাংলায় স্বাধীন সুলতানি আমল (১৩৩৮ – ১৫৩৮ খ্রি. : ২০০ বছর) সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য | ০৪. মুসলিম শাসন ও সুলতানি আমল (প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা) |
| সিকান্দার শাহ (১৩৫৮–১৩৯৩ খ্রি.) | ইলিয়াস শাহের পুত্র | পাণ্ডুয়ায় ভারতের অন্যতম বৃহত্তম ‘আদিনা মসজিদ’ (১৩৬৯ খ্রি.) নির্মাণ করেন | ০৪. মুসলিম শাসন ও সুলতানি আমল (প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা) |
| নাসিরউদ্দিন নুসরত শাহ (১৫১৯–১৫৩২ খ্রি.) | গৌড়ের ‘বড় সোনা মসজিদ’ ও ‘কদম রসুল’ ভবন নির্মাণ করেন | বাবরের সাথে সন্ধি করে বাংলার স্বাধীনতা রক্ষা করেন | ০৪. মুসলিম শাসন ও সুলতানি আমল (প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা) |
| গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহ (১৫৩৩–১৫৩৮ খ্রি.) | বাংলার সর্বশেষ স্বাধীন সুলতান | ১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দে আফগান শাসক শেরশাহ শূর গৌড় দখল করলে বাংলায় ২০০ বছরের স্বাধীন সুলতানি যুগের অবসান ঘটে | ০৪. মুসলিম শাসন ও সুলতানি আমল (প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা) |
| তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা | ১২০৪ সালে বখতিয়ার খলজির নদীয়া জয়ের পর লক্ষ্মণ সেন পূর্ববঙ্গের বিক্রমপুরে চলে যান এবং ১২০৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন | এরপর তাঁর দুই পুত্র বিশ্বরূপ সেন এবং কেশব সেন ১২৩০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত পূর্ববঙ্গ শাসন করেন | ০৪. মুসলিম শাসন ও সুলতানি আমল (প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা) |
| তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা | মুসলিম সুলতানি আমলে শামসউদ্দিন ইলিয়াস শাহ ১৩৫২ খ্রিস্টাব্দে লখনৌতি, সাতগাঁও ও সোনারগাঁও একত্রিত করে সমগ্র বাংলাকে একক শাসনাধীনে আনেন এবং ‘শাহ-ই-বাঙ্গালাহ’ ও ‘শাহ-ই-বাঙালিয়ান’ উপাধি ধারণ করেন | তাঁর সময় থেকেই সমগ্র বাংলাভাষী অঞ্চল ‘বাঙ্গালা’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে | ০৪. মুসলিম শাসন ও সুলতানি আমল (প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা) |
| তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা | হোসেন শাহী বংশের প্রতিষ্ঠাতা সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ ১৪৯৩ থেকে ১৫১৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বৃহত্তর বাংলা শাসন করেন | তাঁর শাসনকালকে বাংলার মধ্যযুগের স্বর্ণযুগ বলা হয় | ০৪. মুসলিম শাসন ও সুলতানি আমল (প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলা) |