টপিক 01: প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং লীগ অব নেশনস
টপিক ০১: প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং লীগ অব নেশনস #
🌐 অধ্যায় পরিচিতি ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট (Chapter Prologue) #
মানব সভ্যতার রাজনৈতিক বিবর্তনের ইতিহাসে বিংশ শতাব্দী ছিল বৈশ্বিক রূপান্তরের এক রক্তক্ষয়ী অধ্যায়। উনবিংশ শতাব্দীর 'ইউরোপীয় কনসার্ট' (Concert of Europe) এবং ওয়েস্টফেলিয়ান ভারসাম্য ব্যবস্থা যে আপেক্ষিক শান্তি বজায় রেখেছিল, বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভে উগ্র সাম্রাজ্যবাদী প্রতিযোগিতা, আগ্রাসী জাতীয়তাবাদ এবং গোপন সামরিক মেরুকরণের ফলে তা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিছক দুটি বৃহৎ ভৌগোলিক যুদ্ধ ছিল না; এগুলো ছিল শিল্পবিপ্লবোত্তর প্রযুক্তিনির্ভর 'সর্বাত্মক যুদ্ধ' (Total War), যা পূর্বতন বৈশ্বিক শক্তি-ভারসাম্যকে চিরতরে ধূলিসাৎ করে আন্তর্জাতিক Relations বা সম্পর্কের গতিপথকে আমূল বদলে দিয়েছিল।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রত্যক্ষ পরিণতিতে চারটি বিশাল সাম্রাজ্যের (অটোমান, অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয়, জার্মানি ও রুশ জারতন্ত্র) পতন ঘটে এবং জন্ম নেয় ইতিহাসের প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক বৈশ্বিক নিরাপত্তা সংস্থা সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ (League of Nations)। তবে পরাশক্তিগুলোর স্বার্থপরতা, নিজস্ব সামরিক শক্তির অভাব এবং উগ্র ফ্যাসিবাদী আগ্রাসন রোধে ব্যর্থতার কারণে মাত্র দুই দশকের মাথায় লীগ অব নেশনস মুখ থুবড়ে পড়ে। সেই ব্যর্থতার ছাই থেকেই সূচিত হয় মানব ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা বিধ্বংসী ও প্রাণঘাতী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। এই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ একদিকে যেমন নাৎসিবাদ ও ফ্যাসিবাদের পতন ঘটিয়েছিল, অন্যদিকে পরমাণু অস্ত্রের যুগে প্রবেশ, দ্বি-মেরুকেন্দ্রিক স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা এবং বর্তমান বিশ্বের প্রধান অভিভাবক জাতিসংঘ (United Nations) প্রতিষ্ঠার দ্বার উন্মোচন করেছিল।
১.১ প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪–১৯১৮): পটভূমি, কারণ, সামরিক জোট ও রণাঙ্গনের সংঘাত #
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ মানব ইতিহাসের প্রথম সামগ্রিক ও বৈশ্বিক যুদ্ধ (Total War)। এ যুদ্ধে বিশ্ববাসী প্রথমবারের মতো ট্রেঞ্চ বা পরিখা যুদ্ধ, বিষাক্ত গ্যাস ও যান্ত্রিক অস্ত্রের ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করে।
ক. সুদূরপ্রসারী ও প্রত্যক্ষ কারণসমূহ #
১. Militarism (সামরিকতাবাদ): ১৯ শতকের শেষভাগে ইউরোপের পরাশক্তিগুলোর মধ্যে অভূতপূর্ব সমরাস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়। বিশেষ করে ব্রিটিশ নৌ-আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করে জার্মান কায়জার দ্বিতীয় উইলহেমের আধুনিক নৌবহর গঠন ও ড্রেডনট (Dreadnought) শ্রেণির যুদ্ধজাহাজ তৈরির উন্মাদনা।
২. Alliances (জোটবদ্ধ রাজনীতি): ইউরোপ দুটি পরস্পরবিরোধী সামরিক বলয়ে বিভক্ত হয়ে পড়ে:
- ট্রিপল অ্যালায়েন্স (Triple Alliance, ১৮৮২): জার্মানি, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি ও ইতালি (পরবর্তীতে ইতালি পক্ষ ত্যাগ করে মিত্রশক্তিতে যোগ দেয়)।
- ট্রিপল আঁতাত (Triple Entente, ১৯০৭): গ্রেট ব্রিটেন, ফ্রান্স ও রাশিয়া (১৯০৪ সালের আঁতাত কর্ডিয়েল ও ১৮৯৪ সালের ফ্রাঙ্কো-রুশ চুক্তির সম্প্রসারিত রূপ)।
৩. Imperialism (সাম্রাজ্যবাদ): আফ্রিকা ও এশিয়ায় কাঁচামাল ও বাজার দখলের উদ্দেশ্যে পরাশক্তিগুলোর মধ্যকার ঔপনিবেশিক লড়াই (যেমন: মরক্কো সংকট ১৯০৫ ও ১৯১১)।
৪. Nationalism (উগ্র জাতীয়তাবাদ): বিশেষ করে বলকান অঞ্চলে প্যান-স্লাভিজম (Pan-Slavism) এবং অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্য থেকে বসনিয়া মুক্ত করে সার্বিয়ার সাথে যুক্ত করার আকঙ্ক্ষা। বলকান অঞ্চল তৎকালীন সময়ে পরিচিত ছিল 'ইউরোপের বারুদাগার' (Powder Keg of Europe) নামে।
৫. প্রত্যক্ষ কারণ (Immediate Spark — সেরায়েভো হত্যাকাণ্ড): ১৯১৪ সালের ২৮ জুন বসনিয়ার রাজধানী সারায়েভোতে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরির সিংহাসনের উত্তরাধিকারী আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ এবং তাঁর স্ত্রী সোফিকে সার্ব চরমপন্থী দল 'ব্ল্যাক হ্যান্ড' (Black Hand বা ক্রনা রুকা)-এর সদস্য গ্যাভরিলো প্রিন্সিপ (Gavrilo Princip) পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি করে হত্যা করেন।
৬. যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সূচনা: অস্ট্রিয়া সার্বিয়াকে কঠোর আল্টিমেটাম দেয়। সার্বিয়া তা প্রত্যাখ্যান করলে অস্ট্রিয়াকে জার্মানি শর্তহীন সমর্থনের 'ব্ল্যাঙ্ক চেক' (Blank Cheque) প্রদান করে। অবশেষে ১৯১৪ সালের ২৮ জুলাই অস্ট্রিয়া সার্বিয়ার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণা করে।
খ. সামরিক জোট ও প্রধান রণাঙ্গন বিন্যাস #
| অক্ষশক্তি / কেন্দ্রীয় শক্তি (Central Powers) | মিত্রশক্তি (Allied Powers) | মূল সামরিক বৈশিষ্ট্য ও ফ্রন্ট |
|---|---|---|
| • জার্মানি (প্রধান সামরিক চালিকাশক্তি) • অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি • অটোমান সাম্রাজ্য (অক্টোবর ১৯১৪-এ যোগদান) • বুলগেরিয়া (১৯১৫-এ যোগদান) |
• গ্রেট ব্রিটেন ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্য • ফ্রান্স • রাশিয়া (১৯১৭ সালে বলশেভিক বিপ্লবের পর পদত্যাগ) • ইতালি (লন্ডন চুক্তির মাধ্যমে ১৯১৫ সালে যোগদান) • মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (এপ্রিল ১৯১৭ সালে যোগদান) • সার্বিয়া, বেলজিয়াম, জাপান, রোমানিয়া, গ্রিস |
• পশ্চিম রণাঙ্গন (Western Front): পরিখা যুদ্ধ (Trench Warfare), রাসায়নিক বিষাক্ত গ্যাস ও ভারী কামানের লড়াই। • পূর্ব রণাঙ্গন (Eastern Front): রাশিয়া বনাম জার্মানি-অস্ট্রিয়ার গতিশীল ও বিস্তৃত সংঘাত। • মধ্যপ্রাচ্য ও গ্যালিপলি: অটোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে মিত্রবাহিনীর জল-স্থল যৌথ আক্রমণ। |
গ. প্রধান যুদ্ধসমূহ ও সামরিক গতিপ্রকৃতি #
- শ্লিফেন পরিকল্পনা (Schlieffen Plan): কাউন্ট আলফ্রেড ফন শ্লিফেন কর্তৃক প্রণীত জার্মান রণকৌশল, যার লক্ষ্য ছিল নিরপেক্ষ বেলজিয়াম ভেদ করে দ্রুত প্যারিস দখল করে ফ্রান্সকে আত্মসমর্পণ করানো, যাতে পরবর্তীতে জার্মানি এককভাবে রাশিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে।
- মার্নের প্রথম যুদ্ধ (First Battle of the Marne, সেপ্টেম্বর ১৯১৪): প্যারিসের উপকণ্ঠে ফরাসি ও ব্রিটিশ বাহিনীর যৌথ প্রতিরোধের মুখে শ্লিফেন পরিকল্পনা সম্পূর্ণ ভেস্তে যায় এবং যুদ্ধটি দীর্ঘমেয়াদী ট্রেন্স যুদ্ধে রূপ নেয়।
- গ্যালিপলির যুদ্ধ (Battle of Gallipoli, ১৯১৫–১৯১৬): কৃষ্ণসাগরের পথ উন্মুক্ত করে রাশিয়াকে সাহায্য পাঠানো এবং কনস্টান্টিনোপল দখলের উদ্দেশ্যে উইনস্টন চার্চিলের পরিকল্পনায় পরিচালিত মিত্রবাহিনীর ব্যর্থ অভিযান। এই যুদ্ধে তুর্কি সেনাপতি মুস্তফা কামাল পাশা (পরবর্তীতে আতাতুর্ক)-র রণকৌশল অটোমানদের ঐতিহাসিক বিজয় এনে দেয়।
- ভার্দুনের যুদ্ধ (Battle of Verdun, ফেব্রুয়ারি–ডিসেম্বর ১৯১৬): ফরাসি জাতীয় প্রতিরক্ষার প্রতীক ভার্দুন দুর্গে জার্মান আক্রমণ। ফরাসি সেনাপতি মার্শাল ফিলিপ পেত্যাঁ (Philippe Pétain) দৃঢ় প্রতিরোধ গড়ে তুলে স্লোগান দেন: "Ils ne passeront pas!" (তারা পার হতে পারবে না)। পেত্যাঁ 'ভার্দুনের সিংহ' নামে খ্যাতি অর্জন করেন।
- জুটল্যান্ডের নৌযুদ্ধ (Battle of Jutland, মে ১৯১৬): প্রথম বিশ্বযুদ্ধের একমাত্র বৃহৎ নৌযুদ্ধ, যা ডেনমার্কের জুটল্যান্ড উপকূলের উত্তর সাগরে ব্রিটিশ গ্র্যান্ড ফ্লিট ও জার্মান হাই সিজ ফ্লিটের মধ্যে সংঘটিত হয়। কৌশলগতভাবে ব্রিটেন উত্তর সাগরে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে।
- সমের যুদ্ধ (Battle of the Somme, জুলাই–নভেম্বর ১৯১৬): ফ্রান্সের সম নদী উপত্যকায় ব্রিটিশ-ফরাসি আক্রমণ। এই যুদ্ধে সামরিক ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ট্যাঙ্ক (ব্রিটিশ মার্ক-১) ব্যবহার করা হয়।
ঘ. ১৯১৭ সালের ঐতিহাসিক মোড় পরিবর্তন #
১. লুসিতানিয়া ডুবি ও জিমারম্যান টেলিগ্রাম:
- ১৯১৫ সালের ৭ মে জার্মান ইউ-বোট (সাবমেরিন) টর্পেডো মেরে ব্রিটিশ যাত্রীবাহী জাহাজ 'লুসিতানিয়া' (RMS Lusitania) ডুবিয়ে দিলে ১২৮ জন মার্কিন নাগরিক নিহত হন।
- ১৯১৭ সালের শুরুতে জার্মানি পুনরায় 'সীমাহীন সাবমেরিন যুদ্ধ' (Unrestricted Submarine Warfare) ঘোষণা করে।
- একই সময়ে ব্রিটিশ গোয়েন্দারা জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার জিমারম্যান কর্তৃক মেক্সিকোতে প্রেরিত গোপন জিমারম্যান টেলিগ্রাম (Zimmermann Telegram) ফাঁস করে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মেক্সিকোকে টেক্সাস, নিউ মেক্সিকো ও অ্যারিজোনা পুনরুদ্ধারের প্রলোভন দেওয়া হয়েছিল।
- এর প্রেক্ষিতে ১৯১৭ সালের ৬ এপ্রিল প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসনের নেতৃত্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জার্মানির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যোগদান করে।
২. রুশ বিপ্লব ও রাশিয়ার যুদ্ধত্যাগ: - ১৯১৭ সালের নভেম্বর (অক্টোবর বিপ্লব) ভি. আই. লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিকরা ক্ষমতা দখল করে যুদ্ধ বন্ধের ডাক দেন।
- ৩ মার্চ ১৯১৮ রাশিয়া জার্মানির সাথে পৃথক ব্রেস্ট-লিটভস্ক চুক্তি (Treaty of Brest-Litovsk) স্বাক্ষর করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করে।
ঙ. যুদ্ধবিরতি (Armistice of Compiègne) #
আমেরিকান তাজা সেনাদল এবং ট্যাঙ্কের ব্যাপক ব্যবহারের মুখে ১৯১৮ সালের গ্রীষ্মে জার্মান সেনাবাহিনী পিছু হটতে বাধ্য হয়। জার্মানিতে নৌ-বিদ্রোহ ও গণবিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে কায়জার দ্বিতীয় উইলহেম নেদারল্যান্ডসে পালিয়ে যান। অবশেষে ১৯১৮ সালের ১১ নভেম্বর সকাল ১১টায় (11th hour of the 11th day of the 11th month) ফ্রান্সের কম্পিয়েন অরণ্যে একটি রেলওয়ের বগিতে মিত্রশক্তি ও জার্মানির মধ্যে যুদ্ধবিরতি স্বাক্ষরিত হয়।
১.২ প্যারিস শান্তি সম্মেলন (১৯১৯) ও ভার্সাই চুক্তি #
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তির পর বিশ্বরাজনীতির পুনর্গঠন এবং বিজিত দেশগুলোর ভাগ্য নির্ধারণে মিত্রশক্তি ফ্রান্সের প্যারিসে সম্মেলন আহ্বান করে।
ক. প্যারিস শান্তি সম্মেলন ও উড্রো উইলসনের ১৪ দফা #
- প্যারিস শান্তি সম্মেলন (১৮ জানুয়ারি ১৯১৯): ফ্রান্সের ভার্সাই রাজপ্রাসাদে উদ্বোধন করা হয়। সম্মেলনে ৩২টি দেশের প্রতিনিধি উপস্থিত থাকলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ন্ত্রণ করেন 'বিগ ফোর' (Big Four)।
- উড্রো উইলসনের ১৪ দফা (Fourteen Points): ৮ জানুয়ারি ১৯১৮ মার্কিন কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনে প্রেসিডেন্ট উইলসন ভবিষ্যৎ বিশ্বশান্তি ও আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রতিষ্ঠার রূপরেখা ঘোষণা করেন। এর ১৪তম দফায় একটি 'সার্বজনীন জাতিপুঞ্জ' (General Association of Nations) গঠনের প্রস্তাব করা হয়, যা পরবর্তীতে লীগ অব নেশনসের জন্ম দেয়।
খ. ভার্সাই চুক্তি (Treaty of Versailles, ১৯১৯) #
- স্বাক্ষর: ১৯১৯ সালের ২৮ জুন ভার্সাই রাজপ্রাসাদের ঐতিহাসিক 'হল অব মিররস' (Hall of Mirrors বা আয়না মহল)-এ জার্মানির সাথে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। লক্ষণীয় যে, ১৮৭১ সালে ফ্রাঙ্কো-প্রুশিয়ান যুদ্ধে ফ্রান্সকে হারিয়ে এই একই আয়না মহলে প্রুশিয়ার রাজা প্রথম উইলহেম নিজেকে জার্মান সম্রাট ঘোষণা করেছিলেন।
- কার্যকর: ১০ জানুয়ারি ১৯২০।
- যুদ্ধাপরাধ ধারা (Article 231 - War Guilt Clause): জার্মানিকে যুদ্ধের একমাত্র দায়ভার কাঁধে নিতে বাধ্য করা হয়।
- ভূখণ্ড বণ্টন: জার্মানির ভূখণ্ডের ১৩% এবং জনসংখ্যার ১০% কেড়ে নেওয়া হয়। ১৮৭১ সালে দখলকৃত আলসাস ও লোরেন প্রদেশ ফ্রান্সকে ফেরত দেওয়া হয়। পোল্যান্ডকে সমুদ্রের প্রবেশাধিকার দিতে জার্মানির মাঝ দিয়ে 'পোলিশ করিডোর' কেটে দেওয়া হয় এবং ডানজিগকে (Danzig) মুক্ত শহর ঘোষণা করা হয়।
- সামরিক বিধিনিষেধ: জার্মান সেনাবাহিনী সর্বোচ্চ ১,০০,০০০ সেনাসদস্যে সীমাবদ্ধ করা হয়। বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীর সাবমেরিন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়। জার্মানির পশ্চিম সীমান্ত ও রাইন নদী সংলগ্ন এলাকাকে স্থায়ীভাবে নিরস্ত্রীকৃত (Demilitarized Zone) ঘোষণা করা হয়।
- অর্থনৈতিক ক্ষতিপূরণ: ক্ষতিপূরণ কমিশন জার্মানির ওপর বিপুল অঙ্কের অর্থাৎ ১৩২ বিলিয়ন গোল্ডমার্ক ($৩৩\text{ বিলিয়ন ডলার}$) জরিমানা ধার্য করে, যা জার্মানির অর্থনীতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়।
⚠️ মার্শাল ফচের ঐতিহাসিক ভবিষ্যদ্বাণী:
ফরাসি সেনাপ্রধান মার্শাল ফার্দিনান্দ ফচ চুক্তিটির অপরিপক্বতা ও প্রতিশোধমূলক প্রকৃতি দেখে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন:
"এটি শান্তি নয়, এটি বিশ বছরের জন্য একটি যুদ্ধবিরতি মাত্র (This is not peace. It is an armistice for twenty years)।"
তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে সত্য হয়েছিল—ঠিক ২০ বছর ২ মাস পর ১৯৩৯ সালে নাৎসি জার্মানি পোল্যান্ড আক্রমণ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা করে।
গ. প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর অন্যান্য সম্পূরক শান্তি চুক্তিসমূহ #
| চুক্তির নাম | স্বাক্ষরের তারিখ | পরাজিত পক্ষ | প্রধান শর্তাবলী ও ভূ-রাজনৈতিক তাৎপর্য |
|---|---|---|---|
| সাঁ জেরমাঁ চুক্তি (St. Germain) | ১০ সেপ্টেম্বর ১৯১৯ | অস্ট্রিয়া | অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্য ভেঙে পৃথক অস্ট্রিয়া ও হাঙ্গেরি রাষ্ট্র গঠিত হয়; চেকোস্লোভাকিয়া ও যুগোস্লাভিয়ার জন্ম হয়। অস্ট্রিয়া ও জার্মানির রাজনৈতিক মিলন (Anschluss) চিরতরে নিষিদ্ধ করা হয়। |
| নিউই চুক্তি (Neuilly) | ২৭ নভেম্বর ১৯১৯ | বুলগেরিয়া | বুলগেরিয়া এজিয়ান সাগরের উপকূলীয় প্রবেশাধিকার গ্রিসের কাছে হারায় এবং রোমানিয়া ও যুগোস্লাভিয়াকে ভূখণ্ড দেয়। |
| ত্রিয়ার্নন চুক্তি (Trianon) | ৪ জুন ১৯২০ | হাঙ্গেরি | ঐতিহাসিক হাঙ্গেরি তার ভূখণ্ডের দুই-তৃতীয়াংশ এবং জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি হারায়। |
| সেভ্রেস চুক্তি (Sèvres) | ১০ আগস্ট ১৯২০ | অটোমান সাম্রাজ্য | অটোমান সাম্রাজ্যের ওপর আরোপিত চরম অপমানজনক চুক্তি; মধ্যপ্রাচ্য ভাগাভাগি এবং আধুনিক তুরস্ককে ক্ষুদ্রাকারে বন্দি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তুর্কি জনগণ এটি প্রত্যাখ্যান করে। |
| লুজান চুক্তি (Lausanne) | ২৪ জুলাই ১৯২৩ | তুরস্ক | মুস্তফা কামাল আতাতুর্কের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিজয়ের পর মিত্রশক্তি সেভ্রেস চুক্তি বাতিল করতে বাধ্য হয়। সুইজারল্যান্ডের লুজানে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির মাধ্যমে আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ তুরস্ক প্রজাতন্ত্র আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়। |
১.৩ লীগ অব নেশনস (League of Nations): প্রাতিষ্ঠানিক রূপ, সাফল্য ও ব্যর্থতা #
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের নারকীয় ধ্বংসযজ্ঞের পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যৌথ নিরাপত্তা ও বিরোধের শান্তিপূর্ণ মীমাংসার মহান ব্রত নিয়ে ইতিহাসের প্রথম সাধারণ আন্তর্জাতিক সংগঠন হিসেবে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ বা লীগ অব নেশনস আত্মপ্রকাশ করে।
ক. সাংগঠনিক কাঠামো ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া #
১. সাধারণ সভা (Assembly): সকল সদস্য রাষ্ট্রের সমন্বয়ে গঠিত। প্রতি সদস্যের একটি করে ভোট ছিল। যেকোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য 'সর্বসম্মত ভোট' (Unanimous Vote) বাধ্যতামূলক ছিল, যা ছিল সংস্থাটির অন্যতম প্রধান দুর্বলতা।
২. কাউন্সিল (Council): স্থায়ী সদস্য (ব্রিটেন, ফ্রান্স, ইতালি, জাপান) এবং ৪টি (পরবর্তীতে সম্প্রসারিত) অস্থায়ী সদস্য নিয়ে গঠিত।
৩. স্থায়ী আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (PCIJ): নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগ শহরে প্রতিষ্ঠিত, যা বর্তমান আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (ICJ) পূর্বসূরি।
৪. আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO): ১৯১৯ সালে ভার্সাই চুক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়ে পরবর্তীতে জাতিসংঘের বিশেষায়িত সংস্থা হিসেবে অব্যাহত থাকে।
খ. লীগ অব নেশনসের প্রধান সাফল্যসমূহ (১৯২০-এর দশক) #
- অলান্দ দ্বীপপুঞ্জ সংকট (Åland Islands, ১৯২১): সুইডেন ও ফিনল্যান্ডের মধ্যকার দ্বীপ বিতর্ক শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করে ফিনল্যান্ডের অধীনে স্বায়ত্তশাসন দেয়।
- আপার সাইলেসিয়া গণভোট (Upper Silesia, ১৯২১): জার্মানি ও পোল্যান্ডের মধ্যে অঞ্চলটি সুষমভাবে ভাগ করে দেয়।
- গ্রিস-বুলগেরিয়া সীমান্ত সংঘাত (১৯২৫): একটি কুকুর সীমান্ত অতিক্রম করাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া যুদ্ধ লীগের হস্তক্ষেপে দ্রুত বন্ধ হয়।
- শরণার্থী ও স্বাস্থ্য কার্যক্রম: ফ্রিডটজফ নানসেনের নেতৃত্বে 'নানসেন পাসপোর্ট' চালুর মাধ্যমে লাখ লাখ যুদ্ধ-শরণার্থীকে পুনর্বাসন করা হয়।
গ. লীগের চরম ব্যর্থতা ও কাঠামোগত দুর্বলতাসমূহ #
- পরাশক্তিদের আগ্রাসনের মুখে নিষ্ক্রিয়তা:
- মাঞ্চুরিয়া সংকট (১৯৩১): জাপান চীনের মাঞ্চুরিয়া দখল করলে লীগ শুধু লিটন কমিশনের তদন্ত ছাড়া কোনো সামরিক ব্যবস্থা নিতে পারেনি। জাপান ১৯৩৩ সালে লীগ ত্যাগ করে।
- জার্মানির চুক্তিভঙ্গ (১৯৩৩): হিটলার ক্ষমতায় এসেই জার্মানিকে লীগ থেকে প্রত্যাহার করেন এবং পুনরায় সামরিকীকরণ শুরু করেন।
- অ্যাবাইসিনিয়া (ইথিওপিয়া) সংকট (১৯৩৫): ফ্যাসিবাদের জনক মুসোলিনি ইথিওপিয়া দখল করলে লীগ কেবল নামকাওয়াস্তে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দেয়, যা ব্যর্থ হয়। ইতালি ১৯৩৭ সালে লীগ ত্যাগ করে।
- সোভিয়েত ইউনিয়নের ফিনল্যান্ড আক্রমণ (১৯৩৯): সোভিয়েত ইউনিয়ন ফিনল্যান্ড আক্রমণ করলে লীগ সোভিয়েত ইউনিয়নকে বহিষ্কার করে, কিন্তু যুদ্ধ থামাতে পারেনি।
- বিলুপ্তি: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পুরো বিশ্ব জড়িয়ে পড়লে লীগ কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে। অবশেষে ১৯৪৬ সালের ১৮-২০ এপ্রিল জেনেভায় ৩৪টি সদস্য দেশের উপস্থিতিতে ২১তম অধিবেশনে লীগ অব নেশনস আনুষ্ঠানিকভাবে ভেঙে দেওয়া হয় এবং এর সমস্ত সম্পদ ও দায় নবগঠিত জাতিসংঘে (UN) হস্তান্তর করা হয়।
১.৪ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯–১৯৪৫): কারণ, ফ্যাসিবাদের উত্থান ও অক্ষশক্তির সূচনা #
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অসমাপ্ত হিসাব এবং ভার্সাই চুক্তির অবমাননাকর শর্তাবলীর ওপর দাঁড়িয়ে ১৯৩৯ সালে মানবজাতির ইতিহাসের দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সূত্রপাত ঘটে।
ক. সুদূরপ্রসারী কারণসমূহ ও উগ্র কর্তৃত্ববাদের উত্থান #
১. ফ্যাসিবাদের উত্থান (ইতালি): ১৯২২ সালে বেনিটো মুসোলিনি তাঁর ব্ল্যাকশার্ট (Blackshirts) মিলিশিয়া নিয়ে 'রোম মার্চ' করে ক্ষমতা দখল করেন।
২. নাৎসিবাদের উত্থান (জার্মানি): ১৯২৯ সালের বিশ্ব অর্থনৈতিক মহামন্দার সুযোগে অ্যাডলফ হিটলার ১৯৩৩ সালে জার্মানির চ্যান্সেলর হন। তিনি জার্মানদের জন্য অতিরিক্ত বাসযোগ্য ভূমি নিশ্চিত করার তত্ত্ব 'লেবেনস্রাউম' (Lebensraum) ঘোষণা করেন।
৩. তুষ্টির নীতি (Appeasement Policy): ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী নেভিল চেম্বারলেইন ও ফরাসি নেতৃবৃন্দ যুদ্ধ এড়াতে হিটলারের বিভিন্ন আগ্রাসন মেনে নেন। এর চূড়ান্ত রূপ ছিল ১৯৩৮ সালের মিউনিখ চুক্তি (Munich Agreement), যার মাধ্যমে চেকোস্লোভাকিয়ার 'সুদেতেনল্যান্ড' হিটলারের হাতে তুলে দেওয়া হয়। চেম্বারলেইন লন্ডনে ফিরে গর্ব করে বলেছিলেন—"Peace for our time", যা ছিল এক বিশাল কূটনৈতিক বিভ্রম।
৪. অক্ষশক্তির জন্ম (Axis Powers): ১৯৩৬ সালে গঠিত হয় রোম-বার্লিন অক্ষ। ১৯৩৬ সালে জার্মানি ও জাপান স্বাক্ষর করে 'অ্যান্টি-কমিন্টার্ন প্যাক্ট'। অবশেষে ২৭ সেপ্টেম্বর ১৯৪০ স্বাক্ষরিত ত্রিপক্ষীয় চুক্তির (Tripartite Pact) মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে রোম-বার্লিন-টোকিও অক্ষ (ROBERTO)।
৫. মলোটভ-রিবেনট্রপ চুক্তি (Molotov-Ribbentrop Pact, ২৩ আগস্ট ১৯৩৯): নাৎসি জার্মানি ও কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে ১০ বছর মেয়াদি এই ঐতিহাসিক অনাক্রমণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর গোপন ধারায় পোল্যান্ডকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার বন্দোবস্ত করা হয়েছিল।
খ. যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সূচনা #
- পোল্যান্ড আক্রমণ: ১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর ভোর ৪টা ৪৫ মিনিটে নাৎসি জার্মানি অতর্কিতে স্থল, আকাশ ও সমুদ্রপথে পোল্যান্ড আক্রমণ করে। ব্যবহৃত হয় নাৎসিদের বিধ্বংসী রণকৌশল 'ব্লিৎসক্রিগ' (Blitzkrieg বা ঝটিকা যুদ্ধ)—বিমানবহর (লুফটওয়াফে) দিয়ে বোমাবর্ষণ এবং দ্রুতগামী প্যানজার (Panzer) আর্মার্ড ডিভিশন দিয়ে প্রতিরক্ষাব্যূহ গুঁড়িয়ে দেওয়া।
- মিত্রশক্তির যুদ্ধ ঘোষণা: পোল্যান্ডের সাথে চুক্তি রক্ষায় ১৯৩৯ সালের ৩ সেপ্টেম্বর গ্রেট ব্রিটেন ও ফ্রান্স জার্মানির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণা করে। এর মাধ্যমে মানব ইতিহাসের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়।
১.৫ প্রধান সামরিক ঘটনাবলী, মোড় ঘোরানো লড়াই ও রণাঙ্গনের বিস্তার #
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, উত্তর আফ্রিকা ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল।
ক. পশ্চিম ইউরোপের লড়াই ও ডানকার্ক উদ্ধার অভিযান (১৯৪০) #
- ফ্রান্সের পতন: জার্মানির ক্ষিপ্রগতির সামনে ফ্রান্সের অপ্রতিরোধ্য ভাবা 'ম্যাজিনো লাইন' (Maginot Line) কোনো কাজে আসেনি; জার্মানি বেলজিয়ামের আর্দেন বনভূমি অতিক্রম করে ফ্রান্সকে মাত্র ৬ সপ্তাহে পরাস্ত করে।
- অপারেশন ডায়নামো (Operation Dynamo / ডানকার্ক মিরাকল): ১৯৪০ সালের ২৬ মে থেকে ৪ জুন পর্যন্ত ফ্রান্সের ডানকার্ক সৈকতে অবরুদ্ধ ব্রিটিশ ও ফরাসি প্রায় ৩ লাখ ৩৮ হাজার সেনাকে শত শত সামরিক ও বেসামরিক মাছ ধরার নৌকার সহায়তায় সফলভাবে উদ্ধার করে যুক্তরাজ্যে নিয়ে আসা হয়।
- ফ্রান্স বিভাজন: ফ্রান্স আত্মসমর্পণ করলে উত্তর ফ্রান্স সরাসরি নাৎসি নিয়ন্ত্রণে যায় এবং দক্ষিণ ফ্রান্সে মার্শাল পেত্যাঁর নেতৃত্বে গঠিত হয় নাৎসিদের তাবেদার 'ভিশি সরকার' (Vichy France)। লন্ডনে বসে জেনারেল শার্ল দ্য গল গড়ে তোলেন 'মুক্ত ফরাসি বাহিনী' (Free French)।
খ. ব্যাটল অব ব্রিটেন (Battle of Britain, ১৯৪০) #
জার্মান বিমানবাহিনী (Luftwaffe) হারমান গোয়েরিং-এর নেতৃত্বে ব্রিটেন দখলের উদ্দেশ্যে ইতিহাসের প্রথম সম্পূর্ণ আকাশযুদ্ধ শুরু করে। ব্রিটিশ রয়েল এয়ার ফোর্স (RAF) সফলভাবে এই হামলা প্রতিহত করে। এ সময় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল তাঁর অবিস্মরণীয় উক্তিতে বলেন:
"Never in the field of human conflict was so much owed by so many to so few." (মানব সংঘাতের ইতিহাসে এত বিপুল সংখ্যক মানুষ এত অল্প সংখ্যক যোদ্ধার কাছে কখনো এত বেশি ঋণী ছিল না।)
গ. অপারেশন বারবারোসা (Operation Barbarossa, ২২ জুন ১৯৪১) #
হিটলার মলোটভ-রিবেনট্রপ অনাক্রমণ চুক্তি পদদলিত করে প্রায় ৩০ লাখ সেনা নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করেন। এটি মানব ইতিহাসের বৃহত্তম স্থল সামরিক অভিযান। সোভিয়েতদের 'পোড়ামাটি নীতি' (Scorched-earth policy) এবং রাশিয়ার হাড়কাঁপানো তীব্র শীত (General Winter) জার্মান বাহিনীকে মস্কোর দোরগোড়ায় থামিয়ে দেয়।
ঘ. পার্ল হারবার আক্রমণ ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে প্রবেশ (৭ ডিসেম্বর ১৯৪১) #
জাপানি নৌবাহিনীর কমান্ডার অ্যাডমিরাল ইসোরোকু ইয়ামামোতোর নেতৃত্বে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের মার্কিন নৌঘাঁটি পার্ল হারবারে (Pearl Harbor) অতর্কিত বিমান হামলা চালানো হয়। এ হামলায় ৪টি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ধ্বংস হয় এবং ২,৪০৩ জন মার্কিন নিহত হন।
- প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট এই দিনটিকে আখ্যা দেন—"A date which will live in infamy" (একটি তারিখ যা কলঙ্কিত হয়ে বেঁচে থাকবে)।
- পরদিনই (৮ ডিসেম্বর) যুক্তরাষ্ট্র জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং জার্মানি-ইতালি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে আমেরিকা সর্বাত্মকভাবে মিত্রশক্তির প্রধান অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি হিসেবে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়।
ঙ. যুদ্ধের মোড় ঘোরানো ৩টি সংঘাত (Turning Points of WW2) #
| মোড় ঘোরানো যুদ্ধ | সময় ও রণাঙ্গন | বিজয়ী বনাম পরাজিত | ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও তাৎপর্য |
|---|---|---|---|
| ১. মিডওয়ের নৌযুদ্ধ (Battle of Midway) | ৪–৭ জুন ১৯৪২ প্রশান্ত মহাসাগর |
মার্কিন নৌবাহিনী (অ্যাডমিরাল চেস্টার নিমিৎজ) বনাম জাপান | মার্কিন নৌবাহিনী জাপানের ৪টি প্রধান বিমানবাহী রণতরী ধ্বংস করে। এর মাধ্যমে প্রশান্ত মহাসাগরে জাপানের আগ্রাসন চিরতরে স্তব্ধ হয়। |
| ২. এল আলামিনের যুদ্ধ (Battle of El Alamein) | অক্টোবর–নভেম্বর ১৯৪২ উত্তর আফ্রিকা (মিশর) |
ব্রিটিশ ৮ম আর্মি (জেনারেল বার্নার্ড মন্টগোমারি) বনাম জার্মান-ইতালি (ফিল্ড মার্শাল এরউইন রোমেল) | 'মরুভূমির শিয়াল' (Desert Fox) খ্যাত এরউইন রোমেলের আফ্রিকা কোর পরাজিত হয় এবং সুয়েজ খাল ও মধ্যপ্রাচ্যের তেলক্ষেত্র নাৎসিদের হাত থেকে রক্ষা পায়। |
| ৩. স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধ (Battle of Stalingrad) | আগস্ট ১৯৪২ – ফেব্রুয়ারি ১৯৪৩ সোভিয়েত ইউনিয়ন (ভোলগা নদী) |
সোভিয়েত লাল ফৌজ (জেনারেল জুকভ) বনাম নাৎসি ৬ষ্ঠ আর্মি (ফিল্ড মার্শাল ফ্রিডরিখ পলাস) | ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা রক্তক্ষয়ী সংঘাত (প্রায় ২০ লাখ নিহত/আহত)। পলাস আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন। এটি নাৎসি জার্মানির পরাজয়ের সূচনা এবং লাল ফৌজের বার্লিনমুখী অগ্রযাত্রার পথ তৈরি করে। |
চ. ডি-ডে বা নরম্যান্ডি অবতরণ (Operation Overlord — ৬ জুন ১৯৪৪) #
মিত্রবাহিনীর সর্বাধিনায়ক মার্কিন জেনারেল ডোয়াইট ডি. আইজেনহাওয়ারের নেতৃত্বে উত্তর ফ্রান্সের নরম্যান্ডি উপকূলে ইতিহাসের সর্ববৃহৎ উভচর জল-স্থল যৌথ আক্রমণ (Amphibious Assault) পরিচালিত হয়।
- এই দিনটি সামরিক ইতিহাসে ডি-ডে (D-Day) নামে পরিচিত।
- পাঁচটি কোডনামযুক্ত সমুদ্র সৈকতে (Utah, Omaha, Gold, Juno, Sword) ১ লাখ ৫৬ হাজারের বেশি সৈন্য অবতরণ করে ফ্রান্সকে নাৎসি দখলমুক্ত করার পথ সুগম করে।
১.৬ মিত্রশক্তির যুদ্ধকালীন ঐতিহাসিক সম্মেলনসমূহ, পারমাণবিক বিস্ফোরণ ও চূড়ান্ত সমাপ্তি #
মিত্রশক্তি যুদ্ধের গতিপথ পরিচালনা এবং যুদ্ধোত্তর বিশ্বব্যবস্থা কীভাবে পরিচালিত হবে, তা নির্ধারণে একাধিক ঐতিহাসিক শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হয়।
ক. যুদ্ধকালীন প্রধান শীর্ষ সম্মেলনসমূহের তুলনামূলক সারণি #
| সম্মেলনের নাম | তারিখ ও স্থান | অংশগ্রহণকারী নেতৃবৃন্দ | প্রধান সিদ্ধান্ত ও ঐতিহাসিক প্রভাব |
|---|---|---|---|
| আটলান্টিক সনদ (Atlantic Charter) | ৯–১২ আগস্ট ১৯৪১ নিউফাউন্ডল্যান্ড উপকূল (USS Augusta) |
ফ্র্যাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট (ইউএসএ) ও উইনস্টন চার্চিল (যুক্তরাজ্য) | যুদ্ধোত্তর বিশ্বে জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার, নিরস্ত্রীকরণ ও যৌথ নিরাপত্তার ৮ দফা নীতি ঘোষণা; জাতিসংঘের মূল ভিত্তি। |
| কাসাব্লাঙ্কা সম্মেলন (Casablanca) | ১৪–২৪ জানুয়ারি ১৯৪৩ মরক্কো |
রুজভেল্ট ও চার্চিল | অক্ষশক্তির কাছ থেকে কেবল 'নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ' (Unconditional Surrender) দাবি করার সিদ্ধান্ত। |
| তেহরান সম্মেলন (Tehran) | ২৮ নভেম্বর – ১ ডিসেম্বর ১৯৪৩ ইরান |
বিগ থ্রি (Big Three): রুজভেল্ট, চার্চিল ও জোসেফ স্তালিন | তিন শীর্ষ নেতার প্রথম মুখোমুখি বৈঠক। পশ্চিম ইউরোপে দ্বিতীয় ফ্রন্ট (ডি-ডে) খোলার প্রতিশ্রুতি। |
| ডাম্বার্টন ওকস সম্মেলন | আগস্ট–অক্টোবর ১৯৪৪ ওয়াশিংটন ডিসি, যুক্তরাষ্ট্র |
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, বিশ্ববিদ্যালয় সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীন | জাতিসংঘ (UN)-এর ভবিষ্যৎ সাংগঠনিক রূপরেখা ও অঙ্গসংস্থাসমূহের প্রাথমিক খসড়া প্রণয়ন। |
| ইয়াল্টা সম্মেলন (Yalta) | ৪–১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৫ ক্রিমিয়া, বিশ্ববিদ্যালয় সোভিয়েত ইউনিয়ন |
রুজভেল্ট, চার্চিল ও স্তালিন | যুদ্ধোত্তর জার্মানিকে ৪টি দখলদার অঞ্চলে (মার্কিন, ব্রিটিশ, ফরাসি, সোভিয়েত) বিভক্ত করা; জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বৃহৎ ৫ শক্তির ভেটো ক্ষমতা (Veto Power) চূড়ান্ত করা; জার্মানির পরাজয়ের ৩ মাসের মধ্যে জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামতে স্তালিনের সম্মতি। |
| সান ফ্রান্সিসকো সম্মেলন | ২৫ এপ্রিল – ২৬ জুন ১৯৪৫ সান ফ্রান্সিসকো, যুক্তরাষ্ট্র |
৫০টি দেশের প্রতিনিধিদল (পরে পোল্যান্ডসহ ৫১) | জাতিসংঘ সনদ (UN Charter) চূড়ান্ত ও ২৬ জুন স্বাক্ষর। |
| পটসডাম সম্মেলন (Potsdam) | ১৭ জুলাই – ২ আগস্ট ১৯৪৫ বার্লিনের নিকটবর্তী পটসডাম |
হ্যারি এস. ট্রুম্যান (যুক্তরাষ্ট্র), ক্লিমেন্ট অ্যাটলি (যুক্তরাজ্য), জোসেফ স্তালিন (সোভিয়েত) | জার্মানির সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ ও নাৎসিমুক্তকরণ (Denazification); জাপানের উদ্দেশ্যে 'পটসডাম ঘোষণা' জারি করে অবিলম্বে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের আল্টিমেটাম। |
খ. ম্যানহাটন প্রজেক্ট ও পারমাণবিক অস্ত্রের যুগে প্রবেশ #
- ম্যানহাটন প্রজেক্ট (Manhattan Project): ১৯৪২ সালে মার্কিন সরকার পারমাণবিক বোমা তৈরির জন্য অত্যন্ত গোপন এই বৈজ্ঞানিক ও সামরিক প্রকল্প গ্রহণ করে।
- বৈজ্ঞানিক পরিচালক: পদার্থবিজ্ঞানী জে. রবার্ট ওপেনহাইমার (যাঁকে বলা হয় 'পারমাণবিক বোমার জনক')।
- সামরিক প্রধান: মেজর জেনারেল লেসলি গ্রোভস।
- ট্রিনিটি টেস্ট (Trinity Test): ১৯৪৫ সালের ১৬ জুলাই নিউ মেক্সিকোর আলামোগোর্দো মরুভূমিতে মানব ইতিহাসের প্রথম সফল পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটানো হয়।
- হিরোশিমা আক্রমণ (৬ আগস্ট ১৯৪৫):
- মার্কিন বি-২৯ বোমারু বিমান 'এনোলা গে' (Enola Gay)—পাইলট: কর্নেল পল টিবেটস (Paul Tibbets)।
- বোমার সাংকেতিক নাম: 'লিটল বয়' (Little Boy)—ইউরেনিয়াম-২৩৫ ভিত্তিক অস্ত্র।
- প্রথম আঘাতেই তাৎক্ষণিকভাবে প্রায় ৮০ হাজার মানুষ এবং পরবর্তীতে রেডিয়েশনে ১ লাখ ৪০ হাজারেরও বেশি প্রাণ হারায়।
- নাগাসাকি আক্রমণ (৯ আগস্ট ১৯৪৫):
- মার্কিন বি-২৯ বিমান 'বক্সকার' (Bockscar)—পাইলট: চার্লস সুইনি (Charles Sweeney)।
- বোমার সাংকেতিক নাম: 'ফ্যাট ম্যান' (Fat Man)—প্লুটোনিয়াম-২৩৯ ভিত্তিক অস্ত্র।
- তাৎক্ষণিকভাবে প্রায় ৪০ হাজার এবং মোট প্রায় ৭৪ হাজার মানুষ নিহত হয়।
গ. অক্ষশক্তির নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ও চূড়ান্ত সমাপ্তি #
- ইতালির পতন: ১৯৪৩ সালেই মুসোলিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। ১৯৪৫ সালের ২৮ এপ্রিল সুইস সীমান্তে কমিউনিস্ট গেরিলাদের হাতে মুসোলিনি ও তাঁর সঙ্গিনী ক্লারা পেতাচ্চি ধরা পড়েন এবং তাঁদের গুলি করে হত্যা করা হয়।
- জার্মানির পতন (V-E Day): পূর্ব দিক থেকে সোভিয়েত লাল ফৌজ বার্লিনের রাইখস্ট্যাগ দখল করলে এবং পশ্চিম দিক থেকে ইঙ্গ-মার্কিন বাহিনী এগিয়ে এলে ১৯৪৫ সালের ৩০ এপ্রিল এডলফ হিটলার তাঁর ফুয়েরার বাংকারে পিস্তল দিয়ে আত্মহত্যা করেন। ১৯৪৫ সালের ৮ মে ফিল্ড মার্শাল ভিলহেল্ম কাইটেল নিঃশর্ত আত্মসমর্পণে স্বাক্ষর করলে ইউরোপে যুদ্ধের অবসান ঘটে, যা পালিত হয় Victory in Europe Day (V-E Day) হিসেবে।
- জাপানের আত্মসমর্পণ (V-J Day): পারমাণবিক বোমার ধ্বংসযজ্ঞ এবং ৮ আগস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নের মাঞ্চুরিয়া আক্রমণের মুখে সম্রাট হিরোহিতো রেডিও ভাষণে পরাজয় মেনে নেন। ১৯৪৫ সালের ২ সেপ্টেম্বর টোকিও উপসাগরে নোঙর করা মার্কিন যুদ্ধজাহাজ 'ইউএসএস মিসৌরি' (USS Missouri)-র ডেকে মিত্রশক্তির পক্ষে জেনারেল ডগলাস ম্যাকআর্থারের উপস্থিতিতে জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মামোরু শিগেমিৎসু নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করেন। এটি পালিত হয় Victory over Japan Day (V-J Day) হিসেবে।
ঘ. প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তুলনামূলক সারণি #
| তুলনামূলক নির্দেশক | প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪–১৯১৮) | দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯–১৯৪৫) |
|---|---|---|
| কালপরিধি | ২৮ জুলাই ১৯১৪ – ১১ নভেম্বর ১৯১৮ ($৪\text{ বছর } ৩\text{ মাস } ১৪\text{ দিন}$) | ১ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ – ২ সেপ্টেম্বর ১৯৪৫ ($৬\text{ বছর } ১\text{ দিন}$) |
| প্রধান রণাঙ্গন | প্রধানত ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আটলান্টিক | ইউরোপ, এশিয়া-প্যাসিফিক, উত্তর আফ্রিকা, আটলান্টিক ও রাশিয়া |
| রণকৌশল ও প্রযুক্তি | পরিখা যুদ্ধ (Trench Warfare), বিষাক্ত মাস্টার্ড গ্যাস, ট্যাঙ্কের সূচনা | ব্লিৎসক্রিগ (ঝটিকা যুদ্ধ), বিমানবাহী রণতরী, রাডার, রকেট (V-2) ও পারমাণবিক বোমা |
| নিহত মানুষের সংখ্যা | আনুমানিক ২ কোটি সামরিক ও বেসামরিক | আনুমানিক ৭ থেকে ৮.৫ কোটি (হলোকাস্টে ৬০ লাখ ইহুদিসহ) |
| প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সংস্থা | লীগ অব নেশনস (League of Nations, ১৯২০) | জাতিসংঘ (United Nations, ১৯৪৫) |
| বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির ফলাফল | ৪টি সাম্রাজ্যের পতন, নতুন ক্ষুদ্র জাতিরাষ্ট্রের উদয় | ইউরোপীয় আধিপত্যের অবসান, ডিকলোনাইজেশন এবং আমেরিকা-সোভিয়েত দ্বি-মেরু স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা |
📊 একনজরে মাস্টার সিন্থেসিস ও তুলনা সারণি (Master Synthesis Table) #
| ঐতিহাসিক বিষয় / চুক্তি / ঘটনা | সুনির্দিষ্ট তারিখ ও সাল | সংশ্লিষ্ট স্থান ও ফ্রন্ট | মূল ব্যক্তিত্ব ও রূপকার | ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও পরীক্ষার জন্য আবশ্যিক তথ্য |
|---|---|---|---|---|
| সেরায়েভো হত্যাকাণ্ড | ২৮ জুন ১৯১৪ | সারায়েভো, বসনিয়া | যুবরাজ ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ ও গ্যাভরিলো প্রিন্সিপ | প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রত্যক্ষ স্ফুলিঙ্গ (Immediate Cause)। |
| প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সূচনা | ২৮ জুলাই ১৯১৪ | ইউরোপীয় রণাঙ্গন | কায়জার উইলহেম, সম্রাট ফ্রাঞ্জ জোসেফ | সার্বিয়ার বিরুদ্ধে অস্ট্রিয়ার আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণা। |
| মার্নের প্রথম যুদ্ধ | ৫–১২ সেপ্টেম্বর ১৯১৪ | মার্ন নদী, ফ্রান্স | জোসেফ জফ্রে বনাম হেলমুথ ভন মোল্টকে | জার্মান শ্লিফেন পরিকল্পনা ব্যর্থ ও পরিখা যুদ্ধের সূচনা। |
| লুসিতানিয়া জাহাজ ডুবি | ৭ মে ১৯১৫ | কেল্টিক সাগর, আয়ারল্যান্ড | জার্মান ইউ-বোট ও ১২৮ জন নিহত আমেরিকান | মার্কিন জনমত জার্মানির বিরুদ্ধে চলে যাওয়ার মূল কারণ। |
| গ্যালিপলির যুদ্ধ | ১৯১৫ – ১৯১৬ | দার্দানেলেস প্রণালী, তুরস্ক | মুস্তফা কামাল পাশা বনাম চার্চিল | অটোমানদের জয় এবং আধুনিক তুরস্কের রূপকারের আত্মপ্রকাশ। |
| ভার্দুনের যুদ্ধ | ২১ ফেব্রু – ১৮ ডিসে ১৯১৬ | ভার্দুন, ফ্রান্স | মার্শাল ফিলিপ পেত্যাঁ ("ভার্দুনের সিংহ") | ফরাসি প্রতিরোধের প্রতীক; প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দীর্ঘতম যুদ্ধ। |
| সমের যুদ্ধ | ১ জুলাই – ১৮ নভে ১৯১৬ | সম নদী, ফ্রান্স | ডগলাস হেইগ (ব্রিটেন) | সামরিক ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ট্যাঙ্কের (Mark-I) ব্যবহার। |
| জিমারম্যান টেলিগ্রাম | জানুয়ারি ১৯১৭ | লন্ডন ও বার্লিন | আর্থার জিমারম্যান (জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী) | মেক্সিকোকে মার্কিন ভূখণ্ড দখলের প্রলোভন; ইউএস যুদ্ধে প্রবেশের অনুঘটক। |
| যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে প্রবেশ (১ম) | ৬ এপ্রিল ১৯১৭ | ওয়াশিংটন ডিসি | উড্রো উইলসন (২৮তম মার্কিন প্রেসিডেন্ট) | মিত্রশক্তির অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তির চূড়ান্ত মোড় পরিবর্তন। |
| ব্রেস্ট-লিটভস্ক চুক্তি | ৩ মার্চ ১৯১৮ | ব্রেস্ট, বেলারুশ | ভি. আই. লেনিন ও ট্রটস্কি বনাম জার্মানি | রাশিয়ার প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্থান। |
| উড্রো উইলসনের ১৪ দফা | ৮ জানুয়ারি ১৯১৮ | মার্কিন কংগ্রেস, ওয়াশিংটন | উড্রো উইলসন | বিশ্বশান্তির ভিত্তি ও লীগ অব নেশনস গঠনের ঐতিহাসিক প্রস্তাবনা। |
| কম্পিয়েন যুদ্ধবিরতি | ১১ নভেম্বর ১৯১৮ (সকাল ১১টা) | কম্পিয়েন বন, ফ্রান্স | মার্শাল ফার্দিনান্দ ফচ ও জার্মান প্রতিনিধি | প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সামরিক সংঘাতের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি (11-11-11)। |
| প্যারিস শান্তি সম্মেলন | ১৮ জানুয়ারি ১৯১৯ | ভার্সাই, প্যারিস | বিগ ফোর (উইলসন, জর্জ, ক্লিমেনসু, অরল্যান্ডো) | বিশ্ব রাজনীতির নতুন মানচিত্র ও শান্তি চুক্তিসমূহের রূপরেখা। |
| ভার্সাই চুক্তি | ২৮ জুন ১৯১৯ | হল অব মিররস, ভার্সাই | বিজয়ী মিত্রশক্তি বনাম পরাজিত জার্মানি | অনুচ্ছেদ ২৩১ দ্বারা জার্মানির ওপর একক যুদ্ধাপরাধ ও ১৩২ বিলিয়ন মার্ক জরিমানা। |
| লীগ অব নেশনস প্রতিষ্ঠা | ১০ জানুয়ারি ১৯২০ | জেনেভা, সুইজারল্যান্ড | উড্রো উইলসন (জনক), স্যার এরিক ড্রামন্ড | সম্মিলিত নিরাপত্তার প্রথম বিশ্বসংস্থা; যুক্তরাষ্ট্র কখনো যোগ দেয়নি। |
| লুজান চুক্তি | ২৪ জুলাই ১৯২৩ | লুজান, সুইজারল্যান্ড | মুস্তফা কামাল আতাতুর্ক বনাম মিত্রশক্তি | সেভ্রেস চুক্তি বাতিল ও আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ তুরস্কের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। |
| মিউনিখ চুক্তি | ৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৩৮ | মিউনিখ, জার্মানি | নেভিল চেম্বারলেইন বনাম হিটলার | তোষণ নীতির চূড়ান্ত উদাহরণ; সুদেতেনল্যান্ড জার্মানিকে অর্পণ। |
| মলোটভ-রিবেনট্রপ চুক্তি | ২৩ আগস্ট ১৯৩৯ | মস্কো, সোভিয়েত ইউনিয়ন | ব্যাচেস্লাভ মলোটভ ও জোয়াচিম ভন রিবেনট্রপ | ১০ বছর মেয়াদি রুশ-জার্মান অনাক্রমণ ও গোপন পোল্যান্ড ভাগাভাগি চুক্তি। |
| দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সূচনা | ১ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ | পোল্যান্ড সীমান্ত | এডলফ হিটলার ও জেনারেল গুদেরিয়ান | জার্মানির পোল্যান্ড আক্রমণের মাধ্যমে ব্লিৎসক্রিগ রণকৌশলের সূচনা। |
| ডানকার্ক উদ্ধার অভিযান | ২৬ মে – ৪ জুন ১৯৪০ | ডানকার্ক সৈকত, ফ্রান্স | ব্রিটিশ নৌবাহিনী ও বেসামরিক বোটমালিক | 'অপারেশন ডায়নামো' দ্বারা ৩ লাখ ৩৮ হাজার সৈন্যের অলৌকিক উদ্ধার। |
| ব্যাটল অব ব্রিটেন | জুলাই – অক্টোবর ১৯৪০ | যুক্তরাজ্যের আকাশসীমা | উইনস্টন চার্চিল ও হিউ ডাউডিং | ইতিহাসের প্রথম পূর্ণাঙ্গ আকাশযুদ্ধ; আরএএফ কর্তৃক জার্মানিকে প্রতিহত। |
| অপারেশন বারবারোসা | ২২ জুন ১৯৪১ | সোভিয়েত সীমান্ত | হিটলার ও ফিল্ড মার্শাল ভন বক | সোভিয়েত ইউনিয়নে নাৎসি আক্রমণ; ইতিহাসের বৃহত্তম স্থল অভিযান। |
| পার্ল হারবার আক্রমণ | ৭ ডিসেম্বর ১৯৪১ | ওহু, হাওয়াই, যুক্তরাষ্ট্র | অ্যাডমিরাল ইয়ামামোতো বনাম রুজভেল্ট | আমেরিকার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সর্বাত্মক প্রবেশের প্রত্যক্ষ কারণ। |
| মিডওয়ের নৌযুদ্ধ | ৪–৭ জুন ১৯৪২ | মিডওয়ে অ্যাটল, প্যাসিফিক | অ্যাডমিরাল চেস্টার নিমিৎজ (ইউএসএ) | প্রশান্ত মহাসাগরীয় রণাঙ্গনে জাপানি নৌশক্তির অগ্রযাত্রা স্তব্ধকারী মোড়। |
| এল আলামিনের যুদ্ধ | ২৩ অক্টো – ৪ নভে ১৯৪২ | এল আলামিন, মিশর | জেনারেল মন্টগোমারি বনাম এরউইন রোমেল | উত্তর আফ্রিকায় অক্ষশক্তির পতন ও সুয়েজ খালের নিরাপত্তা নিশ্চিত। |
| স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধ | ২৩ আগস্ট ১৯৪২ – ২ ফেব্রু ১৯৪৩ | স্তালিনগ্রাদ (ভলগোগ্রাদ) | জেনারেল জুকভ বনাম ফিল্ড মার্শাল পলাস | নাৎসি জার্মানির প্রথম বড় বিপর্যয় এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চূড়ান্ত মোড়। |
| ডি-ডে (Operation Overlord) | ৬ জুন ১৯৪৪ | নরম্যান্ডি উপকূল, ফ্রান্স | জেনারেল ডোয়াইট ডি. আইজেনহাওয়ার | ইতিহাসের সর্ববৃহৎ উভচর যৌথ অবতরণ এবং পশ্চিম ইউরোপ মুক্তকরণ। |
| ইয়াল্টা সম্মেলন | ৪–১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৫ | ইয়াল্টা, ক্রিমিয়া | রুজভেল্ট, চার্চিল ও স্তালিন (Big Three) | জার্মানিকে ৪ অঞ্চলে বিভাজন ও জাতিসংঘে ভেটো ক্ষমতার সমীকরণ চূড়ান্ত। |
| ভি-ই ডে (V-E Day) | ৮ মে ১৯৪৫ | বার্লিন ও ইউরোপীয় রণাঙ্গন | ফিল্ড মার্শাল ভিলহেল্ম কাইটেল | ইউরোপে নাৎসি জার্মানির আনুষ্ঠানিক নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ। |
| হিরোশিমা পারমাণবিক বোমা | ৬ আগস্ট ১৯৪৫ | হিরোশিমা, জাপান | পল টিবেটস (বিমান: এনোলা গে) | মানব ইতিহাসে পারমাণবিক অস্ত্রের প্রথম ব্যবহার ('লিটল বয়', U-235)। |
| নাগাসাকি পারমাণবিক বোমা | ৯ আগস্ট ১৯৪৫ | নাগাসাকি, জাপান | চার্লস সুইনি (বিমান: বক্সকার) | পারমাণবিক অস্ত্রের দ্বিতীয় হামলা ('ফ্যাট ম্যান', Pu-239)। |
| ভি-জে ডে (V-J Day) | ২ সেপ্টেম্বর ১৯৪৫ | যুদ্ধজাহাজ USS Missouri | জেনারেল ম্যাকআর্থার ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিগেমিৎসু | টোকিও উপসাগরে জাপানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মাধ্যমে মহাযুদ্ধের সমাপ্তি। |
| ক্রমিক | মেমোরি টেকনিক ও ছন্দ | মূল ডিকোডিং ও অর্থ | সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক টপিক |
|---|---|---|---|
| ০১ | MAIN | M = Militarism (সামরিকতাবাদ) A = Alliances (গোপন সামরিক জোট) I = Imperialism (সাম্রাজ্যবাদ) N = Nationalism (উগ্র জাতীয়তাবাদ) |
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ৪টি মৌলিক সুদূরপ্রসারী কারণ। |
| ০২ | "জার্মান তুর্কি অস্ত্র বুলিয়েছিল" | জার্মান = জার্মানি তুর্কি = অটোমান (তুরস্ক) অস্ত্র = অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি বুলিয়েছিল = বুলগেরিয়া |
১ম বিশ্বযুদ্ধের অক্ষশক্তি / কেন্দ্রীয় শক্তি (Central Powers)। |
| ০৩ | RO-BER-TO (রোবার্তো) | RO = Rome (ইতালি) BER = Berlin (জার্মানি) TO = Tokyo (জাপান) |
২য় বিশ্বযুদ্ধের অক্ষশক্তি (Axis Powers)। |
| ০৪ | "হিরোর লিটল এনোলা, নাগার ফ্যাট বক্স" | হিরো = হিরোশিমা (৬ আগস্ট) $\rightarrow$ লিটল বয় $\rightarrow$ এনোলা গে বিমান নাগা = নাগাসাকি (৯ আগস্ট) $\rightarrow$ ফ্যাট ম্যান $\rightarrow$ বক্সকার বিমান |
দুই পারমাণবিক হামলার লক্ষ্যস্থল, বোমা ও বোমারু বিমান। |
| ০৫ | "উইলসন জর্জের কাছে ক্লিনের জন্য ওড়ানো ঘোষণা দিল" | উইলসন = উড্রো উইলসন (যুক্তরাষ্ট্র) জর্জ = ডেভিড লয়েড জর্জ (যুক্তরাজ্য) ক্লিন = জর্জেস ক্লিমেনসু (ফ্রান্স) ওড়ানো = ভিত্তোরিও অরল্যান্ডো (ইতালি) |
১৯১৯ প্যারিস শান্তি সম্মেলনের চার শীর্ষ ব্যক্তিত্ব (Big Four)। |
| ০৬ | বিগ থ্রি (Big Three) | রুজভেল্ট (ইউএসএ) + চার্চিল (ইউকে) + স্তালিন (ইউএসএসআর) | তেহরান ও ইয়াল্টা শীর্ষ সম্মেলনের প্রধান তিন মিত্রনেতা। |
| ০৭ | মোড় ঘোরানো ৩ যুদ্ধ (M-E-S) | M = Midway (প্রশান্ত মহাসাগর) E = El Alamein (উত্তর আফ্রিকা) S = Stalingrad (সোভিয়েত ফ্রন্ট) |
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গতিমুখ ঘুরিয়ে দেওয়া ৩টি প্রধান যুদ্ধ। |
| ০৮ | কোড: ১১-১১-১১ | ১১তম মাস (নভেম্বর), ১১তম দিন, সকাল ১১টা (১৯১৮) | প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক অস্ত্রবিরতি (Compiègne)। |