টপিক 18 / ৩০আন্তর্জাতিক পরিবেশ, টেকসই উন্নয়ন ও বৈশ্বিক কূটনীতি📖 স্টাডি নোট

টপিক 18: আন্তর্জাতিক পরিবেশ চুক্তি, জলবায়ু সম্মেলন ও কপ (COP)

টপিক ১৮: আন্তর্জাতিক পরিবেশ চুক্তি, জলবায়ু সম্মেলন ও কপ (COP, Kyoto, Paris, Loss & Damage) #

🌐 অধ্যায় পরিচিতি ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট (Chapter Prologue) #

উনবিংশ শতকের শিল্প বিপ্লবের পর থেকে মানবজাতি জীবাশ্ম জ্বালানি (কয়লা, খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস) পুড়িয়ে অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করেছে। কিন্তু এই সমৃদ্ধির পেছনে পুঞ্জীভূত হয়েছে এক ভয়াবহ বৈশ্বিক দায়—যাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও পরিবেশ বিজ্ঞানের পরিভাষায় বলা হয় 'ট্রেজেডি অব দ্য কমন্স' (Tragedy of the Commons)। ১৯৬৮ সালে মার্কিন পরিবেশবিদ গ্যারেট হার্ডিন এই তত্ত্বে দেখিয়েছিলেন যে, কোনো উন্মুক্ত বা সাধারণ প্রাকৃতিক সম্পদ (যেমন: পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ও মহাসাগর) ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যক্তি বা রাষ্ট্র যখন কেবল নিজস্ব সর্বোচ্চ মুনাফার চিন্তা করে, তখন সামগ্রিকভাবে সেই সাধারণ সম্পদটি চিরতরে ধ্বংসের মুখে পতিত হয়।

জলবায়ু পরিবর্তনের সংকটে এই ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি সবচেয়ে নির্মমভাবে দৃশ্যমান। কারণ, বায়ুমণ্ডলে পুঞ্জীভূত অতিরিক্ত কার্বনের সিংহভাগের জন্য ঐতিহাসিকভাবে দায়ী পশ্চিমা শিল্পোন্নত দেশগুলো; অথচ এর বিরূপ প্রভাবে সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত হচ্ছে বাংলাদেশ, মালদ্বীপ বা প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রসমূহের মতো জলবায়ু-সংবেদনশীল অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো, যাদের কার্বন নির্গমন ১ শতাংশেরও কম। এই ঐতিহাসিক বৈষম্য নিরসনেই জন্ম নিয়েছে আন্তর্জাতিক পরিবেশ আইনের মৌলিক স্তম্ভ: 'কমন বাট ডিফারেনশিয়েটেড রেসপনসিবিলিটিজ অ্যান্ড রেসপেক্টিভ ক্যাপাবিলিটিজ' (CBDR-RC)—অর্থাৎ পরিবেশ সুরক্ষায় সবার সাধারণ দায়বদ্ধতা থাকলেও ঐতিহাসিক নির্গমন ও আর্থিক সক্ষমতা অনুযায়ী উন্নত দেশগুলোকে নেতৃত্ব দিতে হবে।

১৯৭২ সালের স্টকহোম সম্মেলন থেকে শুরু করে ১৯৯৭ সালের কিয়োটো প্রোটোকল, ২০১৫ সালের প্যারিস চুক্তি, এবং সাম্প্রতিক COP28 ও COP29-এর 'লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড' ও 'NCQG' অর্থায়ন—সবই মূলত এই জলবায়ু ন্যায়বিচার (Climate Justice) প্রতিষ্ঠার বৈশ্বিক লড়াই।

টপিক 18: কাঠামোগত রূপরেখা ও বিষয়ভিত্তিক মানচিত্র 🗺️ আন্তর্জাতিক পরিবেশ কূটনীতির অধ্যায় রূপরেখা (Chapter Architecture) পরিবেশ সম্মেলনসমূহ] [শী ম সম্মেলন (১৯৭২) • মন ডটল্যান্ড কমিশন (১৯৮৭) • িত্রী সম্মেলন (১৯৯২) • , বাসেল ও মিনামাটা • কি র্বন ট্যাক্স (CBAM) • অ্ ন্তর্জাতিক সংস্থা ও তহবিল EP (নাইরোবি, ১৯৭২) PCC (নোবেল ২০০৭) GCF (সংদো, দক্ষিণ কোরিয়া) F ও ক্লাইমেট ভালনারেবিলিট 20 ও মুজিব প্ল্যান (MCPP) 📊 মাস্টার সিন্থেসিস ও তাত্ত্বিক কাঠামো রূপরেখা

১৮.১ আন্তর্জাতিক পরিবেশ কূটনীতির ভিত্তি ও বিশ্ব সম্মেলনসমূহ #

বৈশ্বিক পরিবেশ সংকটের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যৌথ পথচলা তিনটি যুগান্তকারী মাইলফলক সম্মেলনের মধ্য দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে:

আন্তর্জাতিক পরিবেশ কূটনীতির 'বিগ থ্রি' মাইলফলক সম্মেলনের নাম সাল ও আয়োজক শহর প্রধান অর্জন ও ঐতিহাসিক অবদান স্টকহোম সম্মেলন ৫–১৬ জুন ১৯৭২ জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (UNEP) প্রতিষ্ঠা; (UNCHE) স্টকহোম (সুইডেন) ৫ জুনকে 'বিশ্ব পরিবেশ দিবস' ঘোষণা ব্রুন্ডটল্যান্ড কমিশন ১৯৮৭ 'আওয়ার কমন ফিউচার' (Our Common Future) (WCED) জাতিসংঘ কমিশন 'টেকসই উন্নয়ন' (Sustainable Dev.) এর সংজ্ঞা রিও ধরিত্রী সম্মেলন ৩–১৪ জুন ১৯৯২ এজেন্ডা ২১, রিও ঘোষণা (CBDR নীতি) ও (Earth Summit/UNCED) রিও ডি জেনিরো (ব্রাজিল) তিনটি প্রধান কনভেনশন (UNFCCC, CBD, UNCCD)

১. স্টকহোম সম্মেলন (UNCHE, ১৯৭২): পরিবেশ কূটনীতির সূতিকাগার #

  • 🏛️ পটভূমি ও তারিখ: পরিবেশ দূষণকে বৈশ্বিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে জাতিসংঘের উদ্যোগে প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলন 'জাতিসংঘ মানব পরিবেশ সম্মেলন' (UNCHE) অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭২ সালের ৫ থেকে ১৬ জুন সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে। এতে ১১৩টি দেশের প্রতিনিধি অংশ নেন।
  • 🌍 বিশ্ব পরিবেশ দিবস (৫ জুন): ৫ জুন সম্মেলনটি শুরু হওয়ার ঐতিহাসিক দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে 'বিশ্ব পরিবেশ দিবস' (World Environment Day) হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
  • 🏢 UNEP-এর জন্ম: স্টকহোম সম্মেলনের ঘোষণার ভিত্তিতে ১৯৭২ সালের ১৫ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ পরিবেশ বিষয়ক শীর্ষ সংস্থা জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (United Nations Environment Programme - UNEP) প্রতিষ্ঠা করে। এর সদর দপ্তর কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবিতে অবস্থিত (উন্নয়নশীল বিশ্বে জাতিসংঘের প্রথম কোনো সদর দপ্তর)। এটি প্রতি বছর পরিবেশের সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক পুরস্কার 'চ্যাম্পিয়নস অব দ্য আর্থ' (Champions of the Earth) প্রদান করে।

২. ব্রুন্ডটল্যান্ড কমিশন ও 'আওয়ার কমন ফিউচার' (১৯৮৭): টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি #

  • 📜 পটভূমি ও নেতৃত্ব: ১৯৮৩ সালে জাতিসংঘের উদ্যোগে গঠিত হয় 'পরিবেশ ও উন্নয়ন বিষয়ক বিশ্ব কমিশন' (World Commission on Environment and Development - WCED)। নরওয়ের সাবেক প্রধানমন্ত্রী গ্রো হারলেম ব্রুন্ডটল্যান্ড (Gro Harlem Brundtland)-এর নেতৃত্বে কমিশনটি গঠিত হয়।
  • 📘 'আওয়ার কমন ফিউচার' (Our Common Future): ১৯৮৭ সালে কমিশন তাদের ঐতিহাসিক প্রতিবেদন 'Our Common Future' (যা ব্রুন্ডটল্যান্ড রিপোর্ট নামে খ্যাত) প্রকাশ করে।
  • 🌿 টেকসই উন্নয়নের কালজয়ী সংজ্ঞা: এই প্রতিবেদনে টেকসই উন্নয়নের যুগান্তকারী সংজ্ঞা দেওয়া হয়: "ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিজেদের চাহিদা মেটানোর সক্ষমতাকে ক্ষুণ্ণ না করে বর্তমানের চাহিদা পূরণ করাই হলো টেকসই উন্নয়ন (Sustainable Development)" (একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি ভূগোল ২য় পত্র)। এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ও পরিবেশ সুরক্ষার ত্রিমুখী ভারসাম্যের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে।

৩. রিও ধরিত্রী সম্মেলন (Earth Summit / UNCED, ১৯৯২) #

  • 🌎 সম্মেলনের রূপরেখা: ১৯৯২ সালের ৩ থেকে ১৪ জুন ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে অনুষ্ঠিত হয় 'জাতিসংঘ পরিবেশ ও উন্নয়ন সম্মেলন' (UNCED), যা ইতিহাসে 'ধরিত্রী সম্মেলন' (Earth Summit) বা রিও সম্মেলন নামে খ্যাত। এতে ১৭২টি দেশের প্রতিনিধি ও ১০৮ জন রাষ্ট্রপ্রধান অংশ নেন।
  • 📜 ধরিত্রী সম্মেলনের ৪টি ঐতিহাসিক দলিল:
    1. রিও ঘোষণা (Rio Declaration): পরিবেশ সুরক্ষায় ২৭টি মূল নীতি সম্বলিত সনদ; যার ৭ম নীতিতে বিখ্যাত CBDR নীতি (কমন বাট ডিফারেনশিয়েটেড রেসপনসিবিলিটি) এবং ১৫তম নীতিতে 'সতর্কতামূলক নীতি' (Precautionary Principle) আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি পায়।
    2. এজেন্ডা ২১ (Agenda 21): একবিংশ শতাব্দীতে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার ৪০টি অধ্যায় বিশিষ্ট বিস্তারিত বৈশ্বিক কর্মপরিকল্পনা।
    3. বন নীতিমালার বিবৃতি (Forest Principles): বন ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণের অ-বাধ্যতামূলক বৈশ্বিক নির্দেশিকা।
  • 🌐 'রিও কনভেনশন ত্রয়ী' (The Three Rio Conventions): ধরিত্রী সম্মেলনে তিনটি পৃথক বাধ্যতামূলক জাতিসংঘ চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য উন্মুক্ত করা হয়:
    • UNFCCC: জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত মূল ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন (সদর দপ্তর: বন, জার্মানি)।
    • CBD: জীববৈচিত্র্য সনদ (Convention on Biological Diversity - সদর দপ্তর: মন্ট্রিল, কানাডা)।
    • UNCCD: মরুকরণ ও খরা প্রতিরোধ কনভেনশন (সদর দপ্তর: বন; World Day to Combat Desertification: ১৭ জুন)।

১৮.২ বৈশ্বিক পরিবেশ ও জলবায়ু চুক্তি ও প্রোটোকলসমূহের পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ #


১. মন্ট্রিল প্রোটোকল (Montreal Protocol, ১৯৮৭): ওজোন স্তর সুরক্ষা #

  • 🛡️ উদ্দেশ্য ও সাফল্য: সূর্য থেকে আসা ক্ষতিকর অতিবেগুনী রশ্মি (UV-B) শোষণকারী পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারের ওজোন স্তর সুরক্ষায় এটি গৃহীত হয়। ১৯৮৭ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর কানাডার মন্ট্রিলে এটি স্বাক্ষরিত হয় এবং ১৯৮৯ সালের ১ জানুয়ারি কার্যকর হয়।
  • ❄️ রাসায়নিক নিষিদ্ধকরণ: ওজোন স্তর ধ্বংসকারী ক্লোরোফ্লুরোকার্বন (CFCs), হ্যালন ও কার্বন টেট্রাক্লোরাইডের মতো রাসায়নিকের বৈশ্বিক উৎপাদন ও ব্যবহার ৯৯% ধাপে ধাপে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব কফি আনান এটিকে "মানব ইতিহাসের একক সর্বাধিক সফল আন্তর্জাতিক চুক্তি" বলে অভিহিত করেন (জোবায়ের’স GK)।
  • 📅 আন্তর্জাতিক ওজোন দিবস: চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হওয়ার দিন স্মরণে প্রতি বছর ১৬ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাপী 'আন্তর্জাতিক ওজোন দিবস' পালিত হয়।
  • 📜 কিগালি সংশোধনী (২০১৬): ওজোন-বান্ধব হলেও শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস হিসেবে কাজ করা হাইড্রোফ্লুরোকার্বন (HFCs) ধাপে ধাপে কমিয়ে আনতে ২০১৬ সালে রুয়ান্ডার কিগালিতে মন্ট্রিল প্রোটোকলে ঐতিহাসিক কিগালি সংশোধনী আনা হয়।

২. কিয়োটো প্রোটোকল (Kyoto Protocol, ১৯৯৭): শিল্পোন্নত দেশের আইনি বাধ্যবাধকতা #

  • 📜 স্বাক্ষর ও কার্যকরের জটিলতা: ১৯৯৭ সালের ১১ ডিসেম্বর জাপানের কিয়োটো শহরে অনুষ্ঠিত COP3 সম্মেলনে এটি গৃহীত হয়। কিন্তু এটি কার্যকর হতে দীর্ঘ ৭ বছর লেগেছিল; কারণ এতে শর্ত ছিল—কমপক্ষে ৫৫টি দেশ এবং ১৯৯০ সালের মোট বৈশ্বিক নির্গমনের ৫৫ শতাংশের অধিকারী উন্নত দেশকে এটি অনুসমর্থন করতে হবে। অবশেষে ২০০৪ সালে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন অনুসমর্থন করলে ২০০৫ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি এটি বিশ্বব্যাপী কার্যকর হয়।
  • ⚖️ টপ-ডাউন কাঠামো (Top-Down Binding Commitments): কিয়োটো প্রোটোকলের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল এটি শুধুমাত্র শিল্পোন্নত দেশগুলোর (Annex I Countries) জন্য আইনিভাবে বাধ্যতামূলক (Legally Binding) নির্গমন হ্রাস লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। প্রথম প্রতিশ্রুতি মেয়াদে (২০০৮-২০১২) উন্নত দেশগুলোকে তাদের গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন ১৯৯০ সালের মাত্রার চেয়ে গড়ে ৫.২% কমানোর বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়।
  • 🧪 ৬টি প্রধান গ্রিনহাউস গ্যাস নিয়ন্ত্রিত:
    1. কার্বন ডাই অক্সাইড ($CO_2$)
    2. মিথেন ($CH_4$)
    3. নাইট্রাস অক্সাইড ($N_2O$)
    4. হাইড্রোফ্লুরোকার্বন (HFCs)
    5. পারফ্লুরোকার্বন (PFCs)
    6. সালফার হেক্সাফ্লোরাইড ($SF_6$)
      (পরবর্তীতে ২০১২ সালের দোহা সংশোধনীতে ৭ম গ্যাস হিসেবে নাইট্রোজেন ট্রাইফ্লোরাইড $NF_3$ যুক্ত করা হয়)।
  • 🔄 কিয়োটোর ৩টি বাজারভিত্তিক নমনীয় মেকানিজম (Flexible Mechanisms):
    • ইন্টারন্যাশনাল এমিশনস ট্রেডিং (IET): কার্বন ক্রেডিট বা পারমিট কেনাবেচার বৈশ্বিক বাজার (Cap-and-Trade)।
    • ক্লিন ডেভেলপমেন্ট মেকানিজম (CDM): উন্নত দেশ অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশে পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে বিনিয়োগ করে কার্বন অফসেট ক্রেডিট (CER - Certified Emission Reduction) অর্জন করতে পারে।
    • জয়েন্ট ইমপ্লিমেন্টেশন (JI): একটি উন্নত দেশ অন্য কোনো উন্নত দেশে পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে বিনিয়োগ করে ক্রেডিট পায়।
  • ❌ ব্যর্থতা ও যুক্তরাষ্ট্রের অস্বীকৃতি: বিশ্বের বৃহত্তম নির্গমনকারী যুক্তরাষ্ট্র (জর্জ ডব্লিউ বুশের প্রশাসন) চীন ও ভারতকে কোনো বাধ্যতামূলক লক্ষ্যমাত্রা না দেওয়ায় কিয়োটো প্রোটোকল কখনোই অনুসমর্থন করেনি; কানাডা ২০১১ সালে প্রত্যাহার করে নেয়।

৩. প্যারিস জলবায়ু চুক্তি (Paris Climate Agreement, ২০১৫ - COP21) #

  • 🤝 ঐতিহাসিক ঐকমত্য: ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর ফ্রান্সের প্যারিসে অনুষ্ঠিত COP21 সম্মেলনে বিশ্বের ১৯৫টি দেশ সর্বসম্মতিক্রমে প্যারিস চুক্তি অনুমোদন করে। ২০১৬ সালের ২২ এপ্রিল (ধরিত্রী দিবসে) জাতিসংঘ সদর দপ্তরে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয় এবং ২০১৬ সালের ৪ নভেম্বর কার্যকর হয়।
  • 🌡️ প্রধান লক্ষ্যমাত্রা (১.৫° সেলসিয়াস থ্রেশহোল্ড): প্রাক-শিল্পায়ন যুগের (১৮৫০-১৯০০) তুলনায় বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশ নিচে রাখা এবং সম্ভব হলে তা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো। বিজ্ঞানীদের মতে, ১.৫ ডিগ্রির উপরে উঠলে পৃথিবীর বহু প্রবালপ্রাচীর ধ্বংস হবে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়ে বহু দ্বীপরাষ্ট্র ডুবে যাবে এবং চরম খরা ও বন্যা স্থায়ী রূপ নেবে।
  • 📋 বটম-আপ কাঠামো ও NDC: কিয়োটোর মতো ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া টপ-ডাউন নয়; বরং প্যারিস চুক্তি পরিচালিত হয় বটম-আপ (Bottom-Up) পদ্ধতিতে। প্রতিটি দেশ তাদের নিজস্ব অর্থনৈতিক সক্ষমতা অনুযায়ী জাতীয় জলবায়ু কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে, যাকে বলা হয় NDC (Nationally Determined Contributions)। প্রতি ৫ বছর পর পর প্রতিটি দেশকে উচ্চাভিলাষী সংশোধিত NDC জাতিসংঘে জমা দিতে হয়।
  • 🔄 প্যারিস চুক্তির অনুচ্ছেদ ৬ ও আন্তর্জাতিক কার্বন মার্কেট (Article 6):
    • অনুচ্ছেদ ৬.২: দুটি দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক কার্বন ক্রেডিট কেনাবেচার ফ্রেমওয়ার্ক (Internationally Transferred Mitigation Outcomes - ITMOs)।
    • অনুচ্ছেদ ৬.৪: জাতিসংঘের সরাসরি তত্ত্বাবধানে কিয়োটো প্রোটোকলের CDM-এর বিকল্প হিসেবে নতুন কেন্দ্রীভূত আন্তর্জাতিক কার্বন ক্রেডিট বাজার।
    • অনুচ্ছেদ ৬.৮: অ-বাজারভিত্তিক সহযোগিতা (জলবায়ু অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সক্ষমতা বৃদ্ধি)।
  • 🔄 গ্লোবাল স্টকটেক (Global Stocktake - GST): প্যারিস চুক্তির অগ্রগতি পরিমাপের জন্য প্রতি ৫ বছর পর পর বিশ্বব্যাপী নির্গমন পর্যালোচনা করা হয়; প্রথম ঐতিহাসিক গ্লোবাল স্টকটেক সম্পন্ন হয় ২০২৩ সালের COP28 দুবাই সম্মেলনে।
  • 🇺🇸 যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক টানাপোড়েন: ২০২০ সালের ৪ নভেম্বর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে প্যারিস চুক্তি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করে নেন। তবে জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনেই (২০ জানুয়ারি ২০২১) এক নির্বাহী আদেশে যুক্তরাষ্ট্রকে পুনরায় প্যারিস চুক্তিতে ফিরিয়ে আনেন।
কিয়োটো প্রোটোকল বনাম প্যারিস চুক্তির তুলনামূলক ব্যবচ্ছেদ তুলনার মাপকাঠি কিয়োটো প্রোটোকল (১৯৯৭) প্যারিস জলবায়ু চুক্তি (২০১৫) আইনি শাসন কাঠামো টপ ডাউন (Top Down Mandate) বটম আপ (Bottom Up Voluntary) অংশগ্রহণের পরিধি শুধুমাত্র উন্নত দেশ (Annex I) বিশ্বের সকল দেশ (উন্নত ও উন্নয়নশীল) লক্ষ্যমাত্রার ধরন আইনি বাধ্যতামূলক নির্গমন হ্রাস স্বেচ্ছাপ্রণোদিত NDC (৫ বছর পরপর হালনাগাদ) তাপমাত্রা লক্ষ্যমাত্রা কোনো নির্দিষ্ট বৈশ্বিক সীমা ছিল না স্পষ্ট বৈশ্বিক সীমা: ২°C এর নিচে, লক্ষ্য ১.৫°C অর্থায়ন প্রতিশ্রুতি সীমিত আর্থিক সহায়তা কাঠামো উন্নত দেশগুলোর ১০০ বিলিয়ন ডলার বার্ষিক লক্ষ্য কার্বন ক্রেডিট মেকানিজম CDM ও জয়েন্ট ইমপ্লিমেন্টেশন অনুচ্ছেদ ৬ (কার্বন মার্কেট ও নন মার্কেট রুট)

৪. ইউরোপীয় ইউনিয়নের কার্বন ট্যাক্স (CBAM - Carbon Border Adjustment Mechanism) #

  • 🇪🇺 উদ্দেশ্য ও প্রয়োগ (২০২৬): জলবায়ু নীতি ফাঁকি দিয়ে উচ্চ কার্বন নির্গমনকারী দেশগুলো থেকে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০২৩ সাল থেকে ট্রানজিশনাল ফেজ শুরু করেছে এবং ২০২৬ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্বন বর্ডার ট্যাক্স (CBAM) কার্যকর করছে। এর ফলে ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, সিমেন্ট, সার ও বিদ্যুতের মতো উচ্চ কার্বন নির্গমনকারী পণ্যের ওপর ইউরোপে প্রবেশকালে কার্বন ট্যাক্স দিতে হবে।
  • 🇧🇩 বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি ও সুযোগ: এটি ভবিষ্যৎ রপ্তানি বাণিজ্যে তৈরি পোশাক (RMG) ও চামড়া শিল্পের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ, যা বাংলাদেশকে দ্রুত নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পরিবেশবান্ধব গ্রিন ফ্যাক্টরি রূপান্তরের তাগিদ দিচ্ছে।

৫. অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক পরিবেশ সনদসমূহ #

কনভেনশনের নাম স্বাক্ষরের সাল ও স্থান মূল সুরক্ষার বিষয়বস্তু ও উদ্দেশ্য বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ও প্রাসঙ্গিকতা
রামসার কনভেনশন (Ramsar) ২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১ (ইরান) আন্তর্জাতিক গুরুত্বসম্পন্ন জলাভূমি (Wetlands) এবং জলচর পাখিদের আবাসস্থল সংরক্ষণ। ২ ফেব্রুয়ারি 'বিশ্ব জলাভূমি দিবস'। বাংলাদেশের ২টি রামসার সাইট: সুন্দরবন (১৯৯২) ও টাঙ্গুয়ার হাওর (২০০০)।
সিআইটিইএস (CITES) ৩ মার্চ ১৯৭৩ (ওয়াশিংটন) বিলুপ্তপ্রায় বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ (৩টি পরিশিষ্টে শ্রেণিবদ্ধ)। ৩ মার্চ 'বিশ্ব বন্যপ্রাণী দিবস'। রয়েল বেঙ্গল টাইগার ও হাতির দাঁতের চোরাচালান রোধে কার্যকর।
বাসেল কনভেনশন (Basel) ২২ মার্চ ১৯৮৯ (সুইজারল্যান্ড) বিপজ্জনক বিষাক্ত বর্জ্যের আন্তঃসীমান্ত চলাচল এবং উন্নয়নশীল দেশে বর্জ্য ফেলা রোধ। চট্টগ্রাম শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে বিষাক্ত রাসায়নিকযুক্ত পুরোনো জাহাজের স্ক্র্যাপ নিয়ন্ত্রণে প্রযোজ্য।
স্টকহোম কনভেনশন (POPs) ২২ মে ২০০১ (সুইডেন) স্থায়ী জৈব দূষক (Persistent Organic Pollutants - POPs) যেমন ডিডিটি ও ডাইঅক্সিন নিষিদ্ধকরণ। মানবদেহে ক্যান্সার সৃষ্টিকারী ১২টি মারাত্মক কীটনাশক ('ডার্টি ডজন') নির্মূলের লক্ষ্য।
মিনামাটা কনভেনশন ১০ অক্টোবর ২০১৩ (জাপান) পারদের (Mercury) ক্ষতিকর স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকি রোধে এর ব্যবহার ও নির্গমন নিষিদ্ধ। জাপানের মিনামাটা উপসাগরে পারদ বিষক্রিয়ায় বহু মানুষের পঙ্গুত্ব ও মৃত্যুর স্মারক।
বন কনভেনশন (CMS) ২৩ জুন ১৯৭৯ (জার্মানি) পরিযায়ী বন্যপ্রাণী প্রজাতি ও তাদের আন্তর্জাতিক অভিবাসন রুট সংরক্ষণ সনদ। পরিযায়ী অতিথি পাখি ও সামুদ্রিক কচ্ছপ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ।

১৮.৩ জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত মূল আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও তহবিল #

বৈশ্বিক জলবায়ু প্রতিষ্ঠান ও তহবিলের প্রাতিষ্ঠানিক ম্যাট্রিক্স প্রতিষ্ঠান / তহবিল সদর দপ্তর ও প্রতিষ্ঠা লক্ষ্য, কার্যক্রম ও অনন্য বৈশিষ্ট্য UNEP নাইরোবি (কেনিয়া) প্রতিষ্ঠা: ১৯৭২ জাতিসংঘের পরিবেশ বিষয়ক শীর্ষ সমন্বয়কারী অঙ্গ; চ্যাম্পিয়নস অব দ্য আর্থ পুরস্কার প্রদান করে IPCC জেনেভা (সুইজারল্যান্ড) প্রতিষ্ঠা: ১৯৮৮ জলবায়ু পরিবর্তনের বৈজ্ঞানিক মূল্যায়নকারী সংস্থা; WMO ও UNEP কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত; ২০০৭ নোবেল শান্তি GCF (গ্রিন ক্লাইমেট) সংদো (দক্ষিণ কোরিয়া) প্রতিষ্ঠা: ২০১০ (COP16) উন্নয়নশীল দেশে প্রশমন ও অভিযোজনে বার্ষিক ১০০ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা তহবিল পরিচালনা Adaptation Fund ওয়াশিংটন ডি.সি. প্রতিষ্ঠা: ২০০১ (COP7) কিয়োটো প্রোটোকলের অধীনে গঠিত অভিযোজন তহবিল; উন্নয়নশীল দেশের সরাসরি প্রকল্প অর্থায়ন LDCF ও SCCF GEF দ্বারা পরিচালিত প্রতিষ্ঠা: ২০০১ স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য বিশেষ জলবায়ু তহবিল জাতীয় অভিযোজন কর্মপরিকল্পনা (NAPA) বাস্তবায়ন IUCN গ্ল্যান্ড (সুইজারল্যান্ড) প্রতিষ্ঠা: ১৯৪৮ বিশ্বের প্রাচীনতম আন্তর্জাতিক পরিবেশ সংস্থা; বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির রেড ডাটা বুক প্রকাশ করে CVF (ক্লাইমেট ফোরাম) রোটেটিং চেয়ার প্রতিষ্ঠা: ২০০৯ ৬৮টি সবচেয়ে জলবায়ু বিপন্ন দেশের রাজনৈতিক জোট; বাংলাদেশ দুবার (২০১১ ১৩, ২০২০ ২২) সভাপতি ছিল

১৮.৪ কনফারেন্স অব দ্য পার্টিজ (COP) শীর্ষ সম্মেলনসমূহের সাম্প্রতিক অগ্রগতি #

UNFCCC সনদে স্বাক্ষরকারী পক্ষসমূহের বার্ষিক সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী সম্মেলনকে 'কনফারেন্স অব দ্য পার্টিজ' (Conference of the Parties - COP) বলা হয়। ১৯৯৫ সালে জার্মানির বার্লিনে COP1 অনুষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে প্রতি বছর বিশ্বের কোনো না কোনো শহরে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

টপিক 18: কাঠামোগত রূপরেখা ও বিষয়ভিত্তিক মানচিত্র ⏱️ কনফারেন্স অব দ্য পার্টিজ (COP) এর ঐতিহাসিক মাইলফলক পরিক্রমা [ COP3: কিয়োটো (১৯৯৭) ] ঐতিহাসিক কিয়োটো প্রটোকল গ্রহণ; উন্নত দেশের ৫.২% হ্রাস লক্ষ্য [ COP13: বালি (২০০৭) ] বালি রোডম্যাপ; জলবায়ু অভিযোজন ফান্ডের রূপরেখা [ COP15: কোপেনহেগেন (২০০৯) ] ২০২০ সালের মধ্যে বার্ষিক ১০০ বিলিয়ন ডলার তহবিলের অঙ্গীকার [ COP16: কানকুন (২০১০) ] গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড (GCF) প্রতিষ্ঠা অনুমোদন [ COP21: প্যারিস (২০১৫) ] ঐতিহাসিক প্যারিস জলবায়ু চুক্তি গ্রহণ (১.৫°C তাপমাত্রা লক্ষ্য) [ COP26: গ্লাসগো (২০২১) ] কয়লা ধাপে ধাপে কমানোর (Phase down) গ্লাসগো ক্লাইমেট প্যাক্ট [ COP27: শার্ম আল শেখ (২০২২) ] ঐতিহাসিক 'লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড' নীতিগত অনুমোদন [ COP28: দুবাই (২০২৩) ] লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড কার্যকর ও 'Transitioning away from fossil fuels' [ COP29: বাকু (২০২৪) ] 'ফিন্যান্স কপ'; ২০৩৫ সালের মধ্যে $৩০০ বিলিয়ন ডলারের NCQG চুক্তি

সাম্প্রতিকতম যুগান্তকারী কপ সম্মেলনসমূহ (২০২২–২০২৬) #

  • 🇪🇬 COP27 (শার্ম আল শেখ, মিসর - ২০২২): জলবায়ু পরিবর্তনের অপূরণীয় ক্ষতি মেটাতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর তিন দশকের দীর্ঘ দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ঐতিহাসিক 'লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড' (Loss and Damage Fund) গঠনের নীতিগত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। পাশাপাশি ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় কারিগরি সহায়তার জন্য 'সান্তিয়াগো নেটওয়ার্ক' (Santiago Network) কার্যকর করা হয়।
  • 🇦🇪 COP28 (দুবাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত - ২০২৩):
    • সম্মেলনের প্রথম দিনেই 'লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড' আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করা হয় এবং প্রথম পর্যায়ে প্রাথমিক তহবিলে প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ডলারের অঙ্গীকার আসে (বিশ্বব্যাংক এই ফান্ডের প্রথম চার বছরের জন্য অন্তর্বর্তীকালীন হোস্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে)।
    • প্যারিস চুক্তির পর প্রথম 'গ্লোবাল স্টকটেক' (GST) সমাপ্ত হয়, যাতে জাতিসংঘ কপ সম্মেলনের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসার বৈশ্বিক আহ্বান—"Transitioning away from fossil fuels in energy systems" পরিভাষাটি সর্বসম্মতিক্রমে নথিবদ্ধ হয়।
    • ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতা তিন গুণ (Tripling Renewables) এবং জ্বালানি দক্ষতা দ্বিগুণ করার অঙ্গীকার গৃহীত হয়।
  • 🇦🇿 COP29 (বাকু, আজারবাইজান - ২০২৪):
    • অর্থায়নের কপ (Finance COP): ২০২৪ সালের ১১ থেকে ২২ নভেম্বর আজারবাইজানের বাকুতে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল জলবায়ু অর্থায়ন।
    • NCQG চুক্তি: উন্নত দেশগুলো তাদের পুরোনো ১০০ বিলিয়ন ডলারের বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা প্রতিস্থাপন করে ২০৩৫ সালের মধ্যে অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য সরকারি-বেসরকারি উৎস থেকে বার্ষিক অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলার (New Collective Quantified Goal - NCQG) জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিত করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে (উত্তরণ বিসিএস একাডেমি)।
    • প্যারিস চুক্তির অনুচ্ছেদ ৬.৪ অনুযায়ী জাতিসংঘের বৈশ্বিক কার্বন বাজারের চূড়ান্ত প্রযুক্তিগত মানদণ্ড অনুমোদন পায়।
  • 🇧🇷 COP30 (বেলেম, ব্রাজিল - ২০২৫/২৬): আমাজন রেইনফরেস্টের প্রবেশদ্বার বেলেমে অনুষ্ঠিতব্য এই সম্মেলনকে প্যারিস চুক্তির এক দশক পূর্তিতে দেশগুলোর উচ্চাভিলাষী সংশোধিত NDC পর্যালোচনা ও আমাজন সুরক্ষার প্রধান বিশ্বমঞ্চ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।

🌳 ভুটান — বিশ্বের প্রথম কার্বন নেগেটিভ দেশ: দক্ষিণ এশিয়ার পার্বত্য দেশ ভুটান কেবল কার্বন নিরপেক্ষ নয়, বরং বিশ্বের প্রথম আনুষ্ঠানিক 'কার্বন নেগেটিভ' (Carbon Negative) দেশ। ভুটানের মোট ভূখণ্ডের ৭০ শতাংশেরও বেশি বনাঞ্চলে ঢাকা, যার ফলে দেশটি বায়ুমণ্ডলে যে পরিমাণ কার্বন নির্গমন করে, তাদের বনাঞ্চল তার চেয়ে প্রায় তিন গুণ বেশি কার্বন ডাই অক্সাইড প্রাকৃতিকভাবে শোষণ করে (MP3 জর্জ আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি)।


📊 একনজরে মাস্টার সিন্থেসিস ও তুলনা সারণি (Master Synthesis Table) #

ক্রমিক চুক্তি / সংস্থা / সম্মেলন গৃহীত / প্রতিষ্ঠার সাল সদর দপ্তর / আয়োজক শহর মূল প্রতিপাদ্য ও লক্ষ্যমাত্রা বর্তমান আইনি স্থিতি ও গুরুত্ব
১ স্টকহোম সম্মেলন (UNCHE) ১৯৭২ স্টকহোম (সুইডেন) প্রথম বৈশ্বিক পরিবেশ সম্মেলন; ৫ জুন পরিবেশ দিবস UNEP প্রতিষ্ঠার ভিত্তিভূমি
২ UNEP ১৯৭২ নাইরোবি (কেনিয়া) জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি; বৈশ্বিক পরিবেশ মূল্যায়ন আন্তর্জাতিক পরিবেশ সনদের অভিভাবক
৩ মন্ট্রিল প্রোটোকল ১৯৮৭ মন্ট্রিল (কানাডা) ওজোন স্তর সুরক্ষা; ৯৯% ক্ষতিকর CFC গ্যাস নিষিদ্ধ সফলতম চুক্তি; ১৬ সেপ্টেম্বর ওজোন দিবস
৪ ব্রুন্ডটল্যান্ড কমিশন ১৯৮৭ জাতিসংঘ সদর দপ্তর 'Our Common Future' রিপোর্ট; টেকসই উন্নয়নের সংজ্ঞা একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক উন্নয়নের চালিকাশক্তি
৫ আইপিসিসি (IPCC) ১৯৮৮ জেনেভা (সুইজারল্যান্ড) জলবায়ু পরিবর্তনের বৈজ্ঞানিক প্রমাণাদি বিশ্লেষণ ২০০৭ সালে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী
৬ রিও ধরিত্রী সম্মেলন ১৯৯২ রিও ডি জেনিরো (ব্রাজিল) এজেন্ডা ২১, রিও ঘোষণা (CBDR নীতি) ও UNFCCC সৃষ্টি আধুনিক বৈশ্বিক পরিবেশ কূটনীতির মহাক্ষেত্র
৭ কিয়োটো প্রোটোকল ১৯৯৭ (কার্যকর ২০০৫) কিয়োটো (জাপান - COP3) উন্নত দেশের ৫.২% নির্গমন হ্রাস; ৬টি গ্রিনহাউস গ্যাস টপ-ডাউন কাঠামো; ২০২০ সালে মেয়াদ সমাপ্ত
৮ গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড (GCF) ২০১০ (COP16) সংদো (দক্ষিণ কোরিয়া) জলবায়ু অর্থায়ন; বার্ষিক ১০০ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ উন্নয়নশীল দেশের অভিযোজন ও প্রশমন তহবিল
৯ প্যারিস জলবায়ু চুক্তি ২০১৫ (COP21) প্যারিস (ফ্রান্স) তাপমাত্রা বৃদ্ধি ২°C-এর নিচে, লক্ষ্য ১.৫°C; NDC প্রণয়ন বটম-আপ কাঠামো; বর্তমান বিশ্বের প্রধান চুক্তি
১০ রামসার কনভেনশন ১৯৭১ রামসার (ইরান) জলাভূমি ও জলচর পাখি সংরক্ষণ; ২ ফেব্রুয়ারি দিবস বাংলাদেশ: সুন্দরবন ও টাঙ্গুয়ার হাওর
১১ বাসেল কনভেনশন ১৯৮৯ বাসেল (সুইজারল্যান্ড) বিপজ্জনক ও বিষাক্ত বর্জ্যের আন্তঃসীমান্ত চলাচল রোধ শিপব্রেকিং ও প্লাস্টিক বর্জ্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর
১২ মিনামাটা কনভেনশন ২০১৩ মিনামাটা (জাপান) পারদের ক্ষতিকর পরিবেশগত নির্গমন ও ব্যবহার বন্ধ পারদ দূষণ রোধে বাধ্যতামূলক জাতিসংঘ চুক্তি
১৩ COP27 (শার্ম আল শেখ) ২০২২ মিসর ঐতিহাসিক 'লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড' নীতিগত অনুমোদন জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর তিন দশকের বিজয়
১৪ COP28 (দুবাই) ২০২৩ সংযুক্ত আরব আমিরাত লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড কার্যকর; জীবাশ্ম জ্বালানি পরিহার বিশ্বব্যাংক অন্তর্বর্তীকালীন হোস্ট (৪ বছর)
১৫ COP29 (বাকু) ২০২৪ আজারবাইজান ফিন্যান্স কপ; ২০৩৫-এর মধ্যে $৩০০ বিলিয়ন NCQG চুক্তি উন্নয়নশীল দেশের জলবায়ু অর্থায়নের নতুন রূপরেখা

ক্রমিক সহজে মনে রাখার ছন্দ / টেকনিক ডিকোডার ও পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ যে কনফিউশন চিরতরে দূর করে
১ স্টকহোমে শুরু, রিওতে ধরিত্রী, প্যারিসে চুক্তি ১৯৭২ = স্টকহোম (পরিবেশ শুরু); ১৯৯২ = রিও (ধরিত্রী সম্মেলন); ২০১৫ = প্যারিস (জলবায়ু চুক্তি)। পরিবেশ কূটনীতির শীর্ষ ৩টি ঐতিহাসিক সম্মেলন ও সালের মিল নির্ভুল থাকে।
২ কিয়োটোর ছয় গ্যাস: কার্বন-মিথেন-নাইট্রে হাইপার সালফার ১. $CO_2$, ২. $CH_4$ (মিথেন), ৩. $N_2O$ (নাইট্রাস), ৪. HFCs (হাইড্রো), ৫. PFCs (পার), ৬. $SF_6$ (সালফার)। কিয়োটোর আওতাভুক্ত ৬টি গ্রিনহাউস গ্যাস দ্রুত শনাক্ত করতে সাহায্য করে।
৩ পরিবেশ সংস্থা সদর দপ্তর কোড: কেনিয়ায় UNEP, কোরিয়ায় GCF, জেনেভায় IPCC UNEP = নাইরোবি (কেনিয়া), GCF = সংদো (দক্ষিণ কোরিয়া), IPCC = জেনেভা (সুইজারল্যান্ড)। আন্তর্জাতিক পরিবেশ সংস্থাগুলোর সদর দপ্তরের সংশয় চিরতরে দূর হয়।
৪ কিয়োটো টপ-ডাউন, প্যারিস বটম-আপ কিয়োটো ছিল ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া বাধ্যতামূলক; প্যারিস চুক্তি হলো নিচ থেকে স্বপ্রণোদিত NDC ভিত্তিক। আন্তর্জাতিক চুক্তিদ্বয়ের কাঠামোগত দর্শনের পার্থক্য মনে থাকে।
৫ ১৬ সেপ্টেম্বর ওজোন দিবস, ৫ জুন পরিবেশ ১৬ সেপ্টেম্বর = মন্ট্রিল চুক্তি ও ওজোন দিবস; ৫ জুন = স্টকহোম সম্মেলন ও বিশ্ব পরিবেশ দিবস। পরিবেশের দুই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক দিবসের তারিখ গুলিয়ে যাওয়া বন্ধ করে।
৬ ২৭-এ লস অ্যান্ড ড্যামেজ অনুমোদন, ২৮-এ কার্যকর COP27 (মিসর ২০২২) = ফান্ড অনুমোদন; COP28 (দুবাই ২০২৩) = ফান্ড কার্যকর। লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ডের সাল ও কপের ক্রম মনে রাখা সহজ হয়।