টপিক 22: ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংকট, ইসরায়েল-ইরান সংঘাত ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি
টপিক ২২: ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংকট, ইসরায়েল-ইরান সংঘাত ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি (Palestine-Israel Conflict, Iran-Israel Escalation & Middle East Geopolitics) #
🌐 অধ্যায় পরিচিতি ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট (Chapter Prologue) #
ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংকট আধুনিক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী, জটিল ও আবেগঘন সংঘাত। বিংশ শতাব্দীর সূচনা থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত এই ভূখণ্ডে যে রক্তক্ষয়ী সংঘাত চলছে, তা কেবল একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকার ভূমি বিরোধ নয়; বরং এটি ঔপনিবেশিক কূটনীতি, জাতীয়তাবাদী আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার, ধর্মীয় অনুভূতি এবং পরাশক্তিগুলোর ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের এক বিধ্বংসী মিলনস্থল।
এই সংকটের বীজ রোপিত হয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য একদিকে অটোমান শাসনের বিরুদ্ধে আরবদের সমর্থন পেতে স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দেয়, অন্যদিকে জায়নিস্ট আন্দোলনের সাথে হাত মিলিয়ে ১৯১৭ সালের কুখ্যাত 'বেলফোর ঘোষণা' (Balfour Declaration)-এর মাধ্যমে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে একটি "ইহুদিদের জাতীয় আবাসভূমি" গড়ে তোলার অঙ্গীকার করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি হলোকাস্টের শিকার লাখ লাখ ইউরোপীয় ইহুদির অভিবাসনের মধ্য দিয়ে এই সংকট চরম আকার ধারণ করে। ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বিতর্কিত রেজুলেশন ১৮১-এর মাধ্যমে ফিলিস্তিনকে আরব ও ইহুদি দুই রাষ্ট্রে বিভক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়, যেখানে জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ ইহুদিদের জন্য ৫৫% ভূমি বরাদ্দ করা হয়।
১৯৪৮ সালের ১৪ মে ইসরায়েল রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ঘোষণার পরপরই শুরু হয় প্রথম আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ। এই যুদ্ধে সাড়ে সাত লক্ষাধিক ফিলিস্তিনি তাদের পৈতৃক ভিটেমাটি থেকে চিরতরে বিতাড়িত হন—যাকে ফিলিস্তিনি ইতিহাসে আখ্যা দেওয়া হয় 'আল-নাকবা' (Al-Nakba / The Catastrophe) বা মহাবিপর্যয়। পরবর্তী সাত দশকে ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধ, ১৯৭৩ সালের ইয়ম কিপুর যুদ্ধ, ক্যাম্প ডেভিড ও অসলো শান্তি চুক্তির ব্যর্থতা ফিলিস্তিনিদেরকে তাদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন থেকে বঞ্চিত করেছে।
একবিংশ শতাব্দীতে এসে এই সংকট নতুন মাত্রা লাভ করেছে। ২০২০ সালের 'আব্রাহাম অ্যাকর্ডস'-এর মাধ্যমে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সাথে ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের ফলে ফিলিস্তিন প্রশ্ন একঘরে হওয়ার মুখে পড়ে। এর প্রতিক্রিয়ায় ৭ অক্টোবর ২০২৩ তারিখে হামাসের নজিরবিহীন 'অপারেশন আল-আকসা ফ্লাড' এবং তার জবাবে গাজায় ইসরায়েলের রক্তক্ষয়ী সামরিক আগ্রাসন সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যকে এক সর্বাত্মক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে উপনীত করেছে। ইরান-নেতৃত্বাধীন 'প্রতিরোধের অক্ষ' (Axis of Resistance), হিজবুল্লাহ ও হুথিদের সরাসরি সম্পৃক্ততা এবং দামেস্ক দূতাবাস হামলার প্রতিশোধে ২০২৪ সালে ইরান-ইসরায়েলের সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিকে আমূল বদলে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (ICJ) ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) কর্তৃক নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি বৈশ্বিক কূটনীতিতে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক তৈরি করেছে।
২২.১ সংকটের ঐতিহাসিক শিকড়: বেলফোর ঘোষণা থেকে ম্যান্ডেট পর্ব #
১. জায়নিস্ট আন্দোলন ও অটোমান সাম্রাজ্য #
- থিওডোর হার্জেল (Theodor Herzl): অস্ট্রিয়ান সাংবাদিক থিওডোর হার্জেলকে আধুনিক রাজনৈতিক জায়নিজমের জনক বলা হয়। ১৮৯৪ সালের ড্রেফাস কেলেঙ্কারির প্রেক্ষাপটে তিনি উপলব্ধি করেন যে ইউরোপে ইহুদিদের নিরাপত্তা কেবল তাদের নিজস্ব রাষ্ট্রে নিশ্চিত হতে পারে। ১৮৯৬ সালে তিনি তাঁর বিখ্যাত বই 'ডার জুডেনস্টাট' (Der Judenstaat - দ্য জিউইশ স্টেট) প্রকাশ করেন।
- বাসেল কংগ্রেস (First Zionist Congress - ১৮৯৭): সুইজারল্যান্ডের বাসেল শহরে হার্জেলের সভাপতিত্বে প্রথম বিশ্ব জায়নিস্ট কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সিদ্ধান্ত হয় যে ফিলিস্তিনের প্রাচীন ভূমিতেই ইহুদিদের জন্য একটি আইনসিদ্ধ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
- প্রথম বিশ্বযুদ্ধে দ্বিমুখী ব্রিটিশ কূটনীতি:
- ম্যাকমাহন-হুসাইন পত্রালাপ (১৯১৫-১৯১৬): অটোমানদের বিরুদ্ধে আরব বিদ্রোহের বিনিময়ে মক্কার শরিফ হুসাইনকে স্বাধীন আরব সাম্রাজ্যের প্রতিশ্রুতি দেয় ব্রিটিশরা।
- সাইকস-পিকো গোপন চুক্তি (১৯১৬): ব্রিটেন ও ফ্রান্স গোপনে অটোমান সাম্রাজ্যের আরব অঞ্চলগুলো নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেয়।
২. বেলফোর ঘোষণা (Balfour Declaration - ২ নভেম্বর ১৯১৭) #
- প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সংকটময় মুহূর্তে আন্তর্জাতিক ইহুদি ব্যাংকার ও জায়নিস্টদের সমর্থন পেতে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার জেমস বেলফোর ব্রিটিশ ইহুদি সম্প্রদায়ের শীর্ষ নেতা লর্ড ওয়াল্টার রথসচাইল্ড-এর কাছে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি প্রেরণ করেন।
- মূল ঘোষণা: চিঠিতে বেলফোর উল্লেখ করেন—"হিজ ম্যাজেস্টি'স গভর্নমেন্ট ফিলিস্তিনে ইহুদি জনগণের জন্য একটি জাতীয় আবাসভূমি (National Home for the Jewish People) প্রতিষ্ঠাকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে এবং এই লক্ষ্য অর্জনে সর্বাত্মক সহায়তা প্রদান করবে।"
- বিরোধিতা ও ক্ষোভ: মাত্র ৬৭ শব্দের এই ঐতিহাসিক চিঠিতে মূল অধিবাসী ফিলিস্তিনি আরবদের উল্লেখ করা হয় নিছক "বিদ্যমান অ-ইহুদি সম্প্রদায়" (Existing Non-Jewish Communities) হিসেবে। এই ঘোষণার মাধ্যমে মূলত এক পক্ষ (ব্রিটেন) এমন একটি ভূমি অন্য পক্ষকে (জায়নিস্ট) দান করে, যার ওপর তাদের কোনো নৈতিক বা ঐতিহাসিক অধিকার ছিল না।
৩. ব্রিটিশ ম্যান্ডেট পর্ব (১৯২০-১৯৪৮) #
- ১৯২০ সালে সান রেমো সম্মেলনে এবং ১৯২২ সালে লিগ অব নেশনস কর্তৃক ফিলিস্তিনে ব্রিটিশ ম্যান্ডেট আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত হয়।
- আলিয়াহ (Aliyah - ইহুদি অভিবাসন): ব্রিটিশ সুরক্ষায় ইউরোপ থেকে লাখ লাখ ইহুদি ফিলিস্তিনে অভিবাসন শুরু করে। ১৯২২ সালে মোট জনসংখ্যার মাত্র ১১% ইহুদি থাকলেও ১৯৪৭ সালে তা বেড়ে ৩৩%-এ দাঁড়ায়।
- আরব বিদ্রোহ (১৯৩৬-১৯৩৯): জমি হারানো ও রাজনৈতিক অস্তিত্ব বিলোপের আশঙ্কায় ফিলিস্তিনিরা ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সাধারণ ধর্মঘট ও বিদ্রোহ শুরু করে। ব্রিটিশরা নির্মমভাবে এই বিদ্রোহ দমন করে কিন্তু পরবর্তীতে ইহুদি সশস্ত্র সংগঠনগুলোর (হাগানাহ, ইরগুন, লেহি) সন্ত্রাসী কার্যক্রমের মুখে অসহায় হয়ে ফিলিস্তিন ত্যাগের সিদ্ধান্ত নেয়।
২২.২ জাতিসংঘ বিভাজন পরিকল্পনা (১৯৪৭) ও আল-নাকবা (১৯৪৮) #
১. জাতিসংঘ রেজুলেশন ১৮১ (UN Partition Plan - ২৯ নভেম্বর ১৯৪৭) #
- ব্রিটিশ সরকার ফিলিস্তিন সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব নবগঠিত জাতিসংঘের ওপর ন্যস্ত করে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ঐতিহাসিক রেজুলেশন ১৮১ পাস হয় (পক্ষে ৩৩, বিপক্ষে ১৩, বিরত ১০)।
- বিভাজন রূপরেখা:
- ইহুদি রাষ্ট্র: ফিলিস্তিনের মোট ভূখণ্ডের ৫৫% এলাকা বরাদ্দ করা হয় (যদিও তারা ছিল মোট জনসংখ্যার ৩৩%)।
- আরব রাষ্ট্র: ফিলিস্তিনের ৪৪% এলাকা বরাদ্দ করা হয় (যদিও তারা ছিল জনসংখ্যার ৬৭%)।
- জেরুজালেম নগরী: ধর্মীয় সংবেদনশীলতার কারণে জেরুজালেম ও বেথলেহেমকে আন্তর্জাতিক শাসনাধীন বিশেষ এলাকা বা 'কর্পাস সেপারেটাম' (Corpus Separatum) মর্যাদা দেওয়া হয়।
- আরবরা এই চরম বৈষম্যমূলক বিভাজন সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে, কিন্তু জায়নিস্ট নেতৃত্ব কৌশলগতভাবে একে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে মেনে নেয়।
২. ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা ও প্রথম আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ (১৯৪৮) #
- ১৪ মে ১৯৪৮: ব্রিটিশ ম্যান্ডেট প্রত্যাহারের কয়েক ঘণ্টা আগে তেল আবিব জাদুঘরে দাঁড়িয়ে জায়নিস্ট নেতা ডেভিড বেন-গুরিয়ন আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরায়েল রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তিনি ইসরায়েলের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন।
- ১৫ মে ১৯৪৮: ঘোষণার পরের দিনই পাঁচটি আরব দেশ (মিশর, সিরিয়া, জর্ডান, লেবানন ও ইরাক) একযোগে নবগঠিত ইসরায়েলের ওপর সামরিক আক্রমণ চালায়। এটি ছিল প্রথম আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ (1948 Arab-Israeli War)।
- সোভিয়েত ও পশ্চিমা অস্ত্র সহায়তায় শক্তিশালী ইসরায়েলি বাহিনী আরব সেনাবাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে। ১৯৪৯ সালের যুদ্ধবিরতি চুক্তির (Armistice Agreement) মাধ্যমে ইসরায়েল জাতিসংঘের প্রস্তাবিত ৫৫% ভূমির পরিবর্তে মূল ফিলিস্তিনের ৭৮% ভূখণ্ড দখল করে নেয়। অবশিষ্ট ২২% ভূখণ্ডের মধ্যে পশ্চিম তীর জর্ডানের এবং গাজা উপত্যকা মিশরের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
৩. আল-নাকবা বা মহাবিপর্যয় (Al-Nakba - ১৫ মে ১৯৪৮) #
- যুদ্ধের সময় ইসরায়েলি মিলিশিয়াদের (ইরগুন, হাগানাহ) বর্বর গণহত্যা (যেমন দিয়ার ইয়াসিন গণহত্যা) এবং পরিকল্পিত জাতিগত নিধনের মুখে ৭ লক্ষ ৫০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি পৈতৃক ভিটেমাটি ত্যাগ করে প্রতিবেশী দেশগুলোতে শরণার্থী হতে বাধ্য হন।
- প্রায় ৫০০ ফিলিস্তিনি গ্রাম ও শহর বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়। ফিলিস্তিনিরা এই ঐতিহাসিক বিপর্যয়কে 'আল-নাকবা' (মহাবিপর্যয়) নামে স্মরণ করে।
- নাকবা দিবস: প্রতি বছর ১৫ মে বিশ্বব্যাপী ফিলিস্তিনিরা 'নাকবা দিবস' পালন করে।
- UNRWA প্রতিষ্ঠা (৮ ডিসেম্বর ১৯৪৯): বিতাড়িত ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের ত্রাণ ও কর্মসংস্থানের জন্য জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ রেজুলেশন ৩০২ দ্বারা UNRWA (United Nations Relief and Works Agency for Palestine Refugees in the Near East) প্রতিষ্ঠা করে।
| সূচক / পরামিতি | ১৯৪৭ সালের জাতিসংঘ বিভাজন পরিকল্পনা | ১৯৪৮-৪৯ সালের যুদ্ধপরবর্তী বাস্তবতা |
|---|---|---|
| ইহুদি / ইসরায়েলি ভূখণ্ড | মোট ভূমির ৫৫% (উপকূলীয় সমভূমি ও নেগেভ মরুভূমি) | যুদ্ধজয়ের মাধ্যমে বৃদ্ধি পেয়ে ৭৮% ভূখণ্ড দখল |
| আরব / ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড | মোট ভূমির ৪৪% (স্বাধীন আরব রাষ্ট্র প্রস্তাব) | কোনো রাষ্ট্র গঠিত হয়নি; পশ্চিম তীর জর্ডানে ও গাজা মিশরে |
| জেরুজালেমের অবস্থান | আন্তর্জাতিক 'কর্পাস সেপারেটাম' (জাতিসংঘ শাসনাধীন) | পশ্চিম জেরুজালেম ইসরায়েলের, পূর্ব জেরুজালেম জর্ডানের দখলে |
| মানবিক পরিণতি | শান্তিপূর্ন সহাবস্থানের তাত্ত্বিক আশা | ৭.৫ লাখ ফিলিস্তিনি শরণার্থী এবং চিরস্থায়ী বাস্তুচ্যুতি |
২২.৩ প্রধান আরব-ইসরায়েল যুদ্ধসমূহ ও মানচিত্রের পরিবর্তন #
১. সুয়েজ সংকট (১৯৫৬) — দ্বিতীয় আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ #
- পটভূমি: ১৯৫৬ সালের ২৬ জুলাই মিশরের জাতীয়তাবাদী প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসের আসওয়ান বাঁধ নির্মাণের অর্থায়নের লক্ষ্যে সুয়েজ খাল জাতীয়করণ করেন।
- ত্রিপক্ষীয় আগ্রাসন (Tripartite Aggression): যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং ইসরায়েল গোপনে সেবাস্তিয়া চুক্তি করে মিশরের সিনাই উপদ্বীপ ও সুয়েজ খালে যৌথ সামরিক আক্রমণ চালায়।
- ফলাফল: মার্কিন প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের তীব্র কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপের মুখে আক্রমণকারী তিন দেশ সেনা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। ইতিহাসে এটি ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের আনুষ্ঠানিক অবসান এবং নাসেরের আরব জাতীয়তাবাদের চূড়ান্তর বিজয় হিসেবে চিহ্নিত হয়। জাতিসংঘ প্রথমবারের মতো সেখানে শান্তিরক্ষী বাহিনী (UNEF) মোতায়েন করে।
২. ঐতিহাসিক ছয় দিনের যুদ্ধ (৫–১০ জুন ১৯৬৭) — তৃতীয় আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ #
- সূচনা: ৫ জুন ১৯৬৭ ভোরে ইসরায়েলি বিমানবাহিনী মিশরীয় বিমানঘাঁটিগুলোতে অতর্কিত বিমান হামলা চালিয়ে রানওয়েতেই পুরো মিশরীয় বিমানবহর ধ্বংস করে দেয়। এরপর জর্ডান ও সিরিয়ার বিরুদ্ধেও দ্রুত আক্রমণ শুরু করে।
- ইসরায়েলের দখলকৃত চার অঞ্চল: মাত্র ৬ দিনের (১৩২ ঘণ্টার) মধ্যে ইসরায়েল তিনটি প্রতিবেশী আরব দেশকে বিধ্বস্ত করে বিশাল ভৌগোলিক এলাকা দখল করে নেয়:
- মিশর থেকে: সিনাই উপদ্বীপ এবং গাজা উপত্যকা।
- জর্ডান থেকে: পশ্চিম তীর (West Bank) এবং অত্যন্ত পবিত্র পূর্ব জেরুজালেম।
- সিরিয়া থেকে: কৌশলগত পাহাড়ি অঞ্চল গোলান মালভূমি (Golan Heights)।
- জাতিসংঘ রেজুলেশন ২৪২ (২২ নভেম্বর ১৯৬৭): নিরাপত্তা পরিষদে গৃহীত এই ঐতিহাসিক প্রস্তাবে সংঘাত নিরসনে বিখ্যাত "শান্তির বিনিময়ে ভূমি" (Land for Peace) মূলনীতি ঘোষণা করা হয় এবং অধিকৃত অঞ্চল থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয়।
- খারতুম শীর্ষ সম্মেলন ও "তিন না" (Three Nos): ১৯৬৭ সালের আগস্টে সুদানের খারতুমে আরব লীগের সম্মেলনে ঘোষণা করা হয়—"ইসরায়েলের সাথে কোনো শান্তি নয়, কোনো স্বীকৃতি নয় এবং কোনো আলোচনা নয়" (No peace, no recognition, no negotiation)।
৩. ইয়ম কিপুর বা রামাদান যুদ্ধ (৬–২৫ অক্টোবর ১৯৭৩) — চতুর্থ আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ #
- সূচনা: ১৯৬৭ সালের হারানো ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের জন্য মিশরের নতুন প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত এবং সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট হাফেজ আল-আসাদ যৌথভাবে ইহুদিদের পবিত্রতম ক্ষমার দিন 'ইয়ম কিপুর' এবং মুসলিমদের রমজান মাসে সিনাই ও গোলানে আকস্মিক আক্রমণ চালান।
- যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি: প্রাথমিক ধাক্কায় মিশরীয় বাহিনী বিখ্যাত 'বার লেভ লাইন' গুঁড়িয়ে সিনাইয়ে প্রবেশ করে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বাত্মক অস্ত্র সহায়তায় ইসরায়েল পাল্টা আক্রমণ চালায়।
- আরব তেল নিষেধাজ্ঞা (OPEC Oil Embargo - ১৯৭৩): সৌদি আরবের বাদশাহ ফয়সালের নেতৃত্বে ওপেক আরব দেশগুলো ইসরায়েলপন্থী পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর তেল নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম ৪০০% বৃদ্ধি পায়, যা প্রথম বৈশ্বিক 'তেল শক' (Oil Shock) তৈরি করে।
- জাতিসংঘ রেজুলেশন ৩৩৮: ২২ অক্টোবর ১৯৭৩ অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি কার্যকর ও রেজুলেশন ২৪২ বাস্তবায়নের নির্দেশ দেয়।
২২.৬ সাত অক্টোবর ২০২৩-এর যুদ্ধ ও সমসাময়িক গাজা সংকট #
১. অপারেশন আল-আকসা ফ্লাড (Operation Al-Aqsa Flood) #
- ৭ অক্টোবর ২০২৩: ইহুদিদের সিমখাত তোরাহ উৎসবের সকালে অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকা থেকে হামাসের সামরিক শাখা ইজ্জেদ্দিন আল-কাসসাম ব্রিগেডের প্রধান মোহাম্মদ দেইফ-এর নির্দেশে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয় স্মরণকালের বৃহত্তম সামরিক অভিযান 'অপারেশন আল-আকসা ফ্লাড' (ত্বোফান আল-আকসা)।
- হামাস যোদ্ধারা কয়েক হাজার রকেট নিক্ষেপ করে গাজার চতুর্দিকে থাকা অত্যাধুনিক বৈদ্যুতিক ও স্মার্ট নিরাপত্তা বেড়া বুলডোজার ও প্যারাগ্লাইডার দিয়ে গুঁড়িয়ে ইসরায়েলের সামরিক ঘাঁটি ও কিবুৎজে প্রবেশ করে।
- ইসরায়েলের শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ ও শিন বেতের চরম ব্যর্থতার প্রমাণ দিয়ে হামাস যোদ্ধারা প্রায় ১,২০০ ইসরায়েলিকে হত্যা করে এবং সামরিক কর্মকর্তাসহ ২৫০ জনেরও বেশি মানুষকে যুদ্ধবন্দী করে গাজায় নিয়ে যায়। ১৯৭৩ সালের ইয়ম কিপুর যুদ্ধের পর ৫০ বছরের মধ্যে এটি ছিল ইসরায়েলের মাটিতে সবচেয়ে বিধ্বংসী আঘাত।
২. ইসরায়েলের আগ্রাসন ও গাজায় মানবিক বিপর্যয় #
- ইসরায়েল অবিলম্বে যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং 'অপারেশন আয়রন সোর্ডস' (Operation Swords of Iron) শুরু করে।
- ইসরায়েলি বিমানবাহিনী গাজার আবাসিক ভবন, বিশ্ববিদ্যালয়, মসজিদ, গির্জা এবং আল-শিফা, নাসের ও ইন্দোনেশিয়ান হাসপাতালের ওপর হাজার হাজার টন বোমা বর্ষণ করে।
- খাদ্য, পানি, জ্বালানি ও ওষুধের সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়ে গাজাকে এক জীবন্ত মৃত্যুপুরীতে পরিণত করা হয়। ৪০ হাজারের বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হন, যার ৭০%-ই নারী ও শিশু। গাজার ২৩ লাখ মানুষের প্রায় ৯০% অভ্যন্তরীণভাবে বারবার বাস্তুচ্যুত হয়।
৩. আন্তর্জাতিক বিচারিক পদক্ষেপ: ICJ ও ICC #
- দক্ষিণ আফ্রিকা বনাম ইসরায়েল (ICJ গণহত্যা মামলা):
- ২৯ ডিসেম্বর ২০২৩ তারিখে দক্ষিণ আফ্রিকা জাতিসংঘের সর্বোচ্চ বিচারালয় আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (ICJ) ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ১৯৪৮ সালের 'জেনোসাইড কনভেনশন' (Genocide Convention) লঙ্ঘনের আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের করে।
- ২৬ জানুয়ারি ২০২৪ অন্তর্বর্তী রায়: আইসিজে ঐতিহাসিক আদেশ জারি করে নির্দেশ দেয় যে ইসরায়েলকে গাজায় গণহত্যা প্রতিরোধে সমস্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ ধ্বংস করা বন্ধ করতে হবে এবং অবিলম্বে গাজায় বাধাহীন মানবিক ত্রাণ প্রবেশের ব্যবস্থা করতে হবে।
- আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) পরোয়ানা আবেদন (২০ মে ২০২৪):
- আইসিসি-র প্রধান প্রসিকিউটর করিম খান (Karim Khan KC) গাজায় যুদ্ধাপরাধ ও অনাহারকে যুদ্ধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্ট-এর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আনুষ্ঠানিক আবেদন জানান।
২২.৭ প্রতিরোধের অক্ষ (Axis of Resistance) ও ইরান-ইসরায়েল সরাসরি সংঘাত #
১. প্রতিরোধের অক্ষের কাঠামো (Axis of Resistance) #
- মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্য ও ইসরায়েলি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে তেহরান-নেতৃত্বাধীন যে রাজনৈতিক ও সামরিক সামরিক অক্ষ গড়ে উঠেছে, তাকে বলা হয় 'মেহভার-ই মোগাভেমেত' (Axis of Resistance)।
- অক্ষের মূল শরিকসমূহ:
- ইরান: ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কোর (IRGC)-এর কুদস ফোর্স দ্বারা অস্ত্র, প্রযুক্তি ও আর্থিক সহায়তাকারী কেন্দ্রবিন্দু।
- হিজবুল্লাহ (লেবানন): মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে সুসজ্জিত অ-রাষ্ট্রীয় সামরিক শক্তি (১ লাখ ৫০ হাজার রকেট ও নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র সমৃদ্ধ)।
- হুথি বা আনসারুল্লাহ (ইয়েমেন): লোহিত সাগরে কৌশলগত বাব এল-মান্দেব প্রণালী অবরুদ্ধ করে ইসরায়েলগামী বাণিজ্যিক জাহাজে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।
- সিরিয়ার আসাদ সরকার: লেবাননে অস্ত্র পরিবহনের প্রধান ট্রানজিট রুট।
- ইরাকের ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স (হাশদ আশ-শাবি): ইরাক ও সিরিয়ায় মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলাকারী দল।
২. দামেস্ক হামলা থেকে ইরান-ইসরায়েল সরাসরি সংঘাত #
- দামেস্ক কনস্যুলেট হামলা (১ এপ্রিল ২০২৪): ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে অবস্থিত ইরানি কনস্যুলেট ভবনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এতে IRGC-র কুদস ফোর্সের শীর্ষ কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ রেজা জাহেদিসহ ৭ জন সিনিয়র কর্মকর্তা নিহত হন। এটি ছিল ইরানের সার্বভৌম ভূখণ্ডের ওপর সরাসরি আগ্রাসন।
- অপারেশন ট্রু প্রমিজ (Operation True Promise - ১৩-১৪ এপ্রিল ২০২৪):
- কনস্যুলেট হামলার প্রতিশোধে ইরান নিজ ভূখণ্ড থেকে সরাসরি ইসরায়েলের ওপর ইতিহাসের বৃহত্তম সমন্বিত ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণ চালায়।
- ৩০০টিরও বেশি শাহেদ ড্রোন, ক্রুজ ও ফাত্তাহ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র একযোগে নিক্ষেপ করা হয়। ইসরায়েলের নেভাতিম বিমানঘাঁটিতে সরাসরি আঘাত হানে।
- তেহরানে ইসমাইল হানিয়া হত্যাকাণ্ড (৩১ জুলাই ২০২৪): ইরানের নতুন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়ে তেহরানের একটি সুরক্ষিত অতিথি ভবনে হামাসের পলিটব্যুরো প্রধান ইসমাইল হানিয়া ইসরায়েলি গোয়েন্দা অভিযানে শহীদ হন।
- বৈরুতে হাসান নাসরুল্লাহ হত্যাকাণ্ড (২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৪): বৈরুতের দাহিয়েহ এলাকায় ইসরায়েলের বাঙ্কার-বাস্টার বোমাবর্ষণে হিজবুল্লাহর দীর্ঘকালীন মহাসচিব সাইয়েদ হাসান নাসরুল্লাহ শহীদ হন।
- অপারেশন ট্রু প্রমিজ ২ (১ অক্টোবর ২০২৪): হানিয়া ও নাসরুল্লাহ হত্যার প্রতিশোধে ইরান ইসরায়েলের তিনটি সামরিক ঘাঁটিতে ২০০টিরও বেশি হাইপারসনিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে।
- ২৬ অক্টোবর ২০২৪ ইসরায়েলি পাল্টা আক্রমণ: ইসরায়েলি বিমানবাহিনী ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্রে সীমিত বিমান হামলা চালায়। এটি ছায়াযুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে দুই আঞ্চলিক পরাশক্তির সরাসরি রণাঙ্গনে রূপান্তরের বার্তা দেয়।
২২.৮ তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও বাংলাদেশের সাংবিধানিক অবস্থান #
১. আন্তর্জাতিক সম্পর্কের তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ #
- সেটলার কলোনিয়ালিজম ও বর্ণবাদ (Settler Colonialism & Apartheid): রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর (অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ২০২২, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ২০২১ এবং ইসরায়েলি সংস্থা বি'ৎসেলেম) বিশ্লেষণ অনুযায়ী, অধিকৃত পশ্চিম তীর ও গাজায় ইসরায়েলের শাসন কোনো সাধারণ সামরিক দখলদারিত্ব নয়; এটি আন্তর্জাতিক আইনে সংজ্ঞায়িত বর্ণবাদ (Apartheid)-এর নিকৃষ্ট উদাহরণ। যেখানে একই ভূখণ্ডে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের জন্য নাগরিক আইন এবং ফিলিস্তিনিদের জন্য সামরিক আইনের দ্বৈত কাঠামো কার্যকর।
- আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য (Balance of Power): মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-উপসাগরীয় আরব জোট বনাম ইরান-চীন-রাশিয়া বলয়ের মধ্যকার ভারসাম্য রক্ষার এক জটিল খেলায় ফিলিস্তিন ভূখণ্ড একটি প্রধান কৌশলগত দাবার ঘুঁটিতে পরিণত হয়েছে।
২. বাংলাদেশের অবিচল ঐতিহাসিক ও সাংবিধানিক সংহতি #
- বঙ্গবন্ধুর পররাষ্ট্রনীতি: বাংলাদেশের সংবিধানে (অনুচ্ছেদ ২৫) সুস্পষ্টভাবে জাতীয় মুক্তি আন্দোলন ও ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে লড়াইকারী জনগণের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে। ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মিশরে ২৮ সদস্যের মেডিকেল টিম এবং এক লাখ পাউন্ড চা পাঠিয়ে ফিলিস্তিন ও আরবদের প্রতি বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক সমর্থন ঘোষণা করেন।
- পাসপোর্টের শর্ত: ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশি পাসপোর্টে লেখা ছিল—"This passport is valid for all countries of the world except Israel"। পরবর্তীকালে ই-পাসপোর্টের আন্তর্জাতিক মানে রূপান্তরের অংশ হিসেবে "except Israel" বাক্যটি তুলে নেওয়া হলেও বাংলাদেশ সরকার একাধিকবার স্পষ্ট করেছে যে ইসরায়েলের সাথে কোনো কূটনৈতিক, বাণিজ্যিক বা ভিসা সম্পর্ক নেই এবং ফিলিস্তিন মুক্তি না পাওয়া পর্যন্ত এই অবস্থান অপরিবর্তিত থাকবে।
- দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান: বাংলাদেশ ১৯৬৭ সালের যুদ্ধপূর্ব সীমানার ভিত্তিতে পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও কার্যকর ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবির প্রতি জাতিসংঘ ও ওআইসি-তে দৃঢ় সমর্থন বজায় রেখেছে।
📊 একনজরে মাস্টার সিন্থেসিস ও তুলনা সারণি (Master Synthesis Table) #
| ঐতিহাসিক পর্ব / চুক্তি / যুদ্ধ | সুনির্দিষ্ট তারিখ ও সন | প্রধান পক্ষ / নেতৃত্ব | আন্তর্জাতিক চুক্তি / রেজুলেশন | ভৌগোলিক পরিবর্তন ও কৌশলগত ফলাফল |
|---|---|---|---|---|
| বেলফোর ঘোষণা | ২ নভেম্বর ১৯১৭ | আর্থার বেলফোর বনাম লর্ড রথসচাইল্ড | ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিঠি | ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জন্য 'জাতীয় আবাসভূমি' প্রতিষ্ঠার ব্রিটিশ অঙ্গীকার। |
| জাতিসংঘ বিভাজন পরিকল্পনা | ২৯ নভেম্বর ১৯৪৭ | সাধারণ পরিষদ (UNGA) | UNGA রেজুলেশন ১৮১ | ফিলিস্তিনকে ৫৫% ইহুদি ও ৪৪% আরব রাষ্ট্রে বিভক্ত করার প্রস্তাব; প্রত্যাখ্যাত। |
| ইসরায়েল প্রতিষ্ঠা ও নাকবা | ১৪-১৫ মে ১৯৪৮ | ডেভিড বেন-গুরিয়ন ও ৫ আরব রাষ্ট্র | ১৯৪৯ যুদ্ধবিরতি (গ্রিন লাইন) | ইসরায়েল ৭৮% ভূমি দখল করে; আল-নাকবায় ৭.৫ লাখ ফিলিস্তিনি বিতাড়িত। |
| সুয়েজ সংকট | অক্টোবর-নভেম্বর ১৯৫৬ | মিশর বনাম যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও ইসরায়েল | প্রথম জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী (UNEF) | সুয়েজ খালের ওপর মিশরের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা; ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের পতন। |
| ছয় দিনের যুদ্ধ | ৫–১০ জুন ১৯৬৭ | ইসরায়েল বনাম মিশর, জর্ডান ও সিরিয়া | UNSC রেজুলেশন ২৪২ | চার অঞ্চল দখল: পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম, গাজা, সিনাই ও গোলান মালভূমি। |
| ইয়ম কিপুর যুদ্ধ | ৬–২৫ অক্টোবর ১৯৭৩ | মিশর ও সিরিয়া বনাম ইসরায়েল | UNSC রেজুলেশন ৩৩৮ | বার লেভ লাইনের পতন; ওপেকের তেল নিষেধাজ্ঞা; ক্যাম্প ডেভিড চুক্তির সূচনা। |
| ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি | ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৭৮ | আনোয়ার সাদাত ও মেনাখেম বেগিন | ১৯৭৯ মিশর-ইসরায়েল শান্তি চুক্তি | ইসরায়েলকে প্রথম কোনো আরব দেশের স্বীকৃতি; সম্পূর্ণ সিনাই উপদ্বীপ মিশরে ফেরত। |
| অসলো-১ শান্তি চুক্তি | ১৩ সেপ্টেম্বর ১৯৯৩ | ইয়াসির আরাফাত ও আইজ্যাক রবিন | অসলো ডিক্লারেশন অব প্রিন্সিপলস | পিএলও ও ইসরায়েলের পারস্পরিক স্বীকৃতি; ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ (PA) গঠন। |
| আব্রাহাম অ্যাকর্ডস | সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর ২০২০ | ইসরায়েল, ইউএই, বাহরাইন, সুদান, মরক্কো | ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক মধ্যস্থতাকৃত | ৪টি আরব দেশের সাথে ইসরায়েলের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ; ফিলিস্তিন প্রশ্নে ধাক্কা। |
| অপারেশন আল-আকসা ফ্লাড | ৭ অক্টোবর ২০২৩ | হামাস বনাম ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী | কাসসাম ব্রিগেডের অভিযান | ইসরায়েলের মাটিতে নজিরবিহীন আক্রমণ; ১,২০০ নিহত; ২৫০+ যুদ্ধবন্দী। |
| আইসিজে গণহত্যা মামলা | ২৯ ডিসেম্বর ২০২৩ / ২৬ জানু ২০২৪ | দক্ষিণ আফ্রিকা বনাম ইসরায়েল | ১৯৪৮ জেনোসাইড কনভেনশন | গাজায় গণহত্যা প্রতিরোধে ইসরায়েলকে ছয় দফা অন্তর্বর্তী আদেশ প্রদান। |
| অপারেশন ট্রু প্রমিজ ১ ও ২ | এপ্রিল ও অক্টোবর ২০২৪ | ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরান বনাম ইসরায়েল | দামেস্ক ও বৈরুত হত্যাকাণ্ডের জবাব | ছায়াযুদ্ধের অবসান; ইরান থেকে ইসরায়েলে সরাসরি শত শত ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ। |
| কোড / ছন্দ | পূর্ণরূপ / মূল ভাবার্থ | জড়িত বিষয় / দেশ | পরীক্ষার জন্য যেভাবে মনে রাখবেন |
|---|---|---|---|
| ইউ-বা-সু-ম | ইউএই, বাহরাইন, সুদান, মরক্কো | ২০২০ সালে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে স্বাক্ষরকারী চার আরব দেশ | ক্রমানুসারে আরব দেশ চারটির নাম মুখস্থ রাখার ম্যাজিক সূত্র। |
| প-পূ-গো-গা | পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম, গোলান মালভূমি, গাজা | ১৯৬৭ সালের ৬ দিনের যুদ্ধে ইসরায়েলের দখলকৃত চার এলাকা | লিখিত ও প্রিলিমিনারিতে ভূখণ্ড হারানোর সঠিক তালিকা। |
| আ-র-পে (১৯৯৪) | আরাফাত, রবিন, পেরেজ | ১৯৯৪ সালে অসলো চুক্তির জন্য শান্তিতে নোবেলজয়ী ত্রয়ী | তিন নোবেল বিজয়ীর আদ্যক্ষর দিয়ে সহজে স্মরণ রাখার কৌশল। |
| ৫৫-৪৪-১ | ৫৫% ইহুদি, ৪৪% আরব, ১% আন্তর্জাতিক জেরুজালেম | ১৯৪৭ সালের জাতিসংঘ বিভাজন পরিকল্পনা (রেজুলেশন ১৮১) | ভূমি বণ্টনের বিতর্কিত শতাংশ সহজে মনে রাখার সূত্র। |
| তিন 'না' (Three Nos) | কোনো শান্তি নয়, কোনো স্বীকৃতি নয়, কোনো আলোচনা নয় | ১৯৬৭ সালের খারতুম আরব লীগ শীর্ষ সম্মেলনের মূলনীতি | আরব বিশ্বের ঐতিহাসিক অনমনীয় অবস্থান বোঝাতে ব্যবহৃত। |
| Area C (৬০%) | ৬০% ভূমিতে ইসরায়েলি পূর্ণ সামরিক ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ | ১৯৯৫ অসলো-২ চুক্তি অনুযায়ী পশ্চিম তীরের প্রশাসনিক বিভাজন | ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্রহীনতার মূল আইনি প্রতিবন্ধকতা নির্দেশক। |