টপিক 25: বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা সংস্থা ও বাংলাদেশি প্রেক্ষাপট (Intelligence Agencies)
টপিক ২৫: বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা সংস্থা ও বাংলাদেশি প্রেক্ষাপট (Intelligence Agencies: CIA, Mossad, MI6, RAW, ISI, Five Eyes & Bangladesh) #
🌐 অধ্যায় পরিচিতি ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট (Chapter Prologue) #
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দৃশ্যমান কূটনীতির সমান্তরালে নীরবে পরিচালিত হয় এক চিরন্তন ছায়াযুদ্ধ—যার মূল নিয়ন্ত্রক বিশ্বের শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থাসমূহ। প্রাচীন ভারতীয় দার্শনিক কৌটিল্যের 'অর্থশাস্ত্র' কিংবা চীনা সমরবিদ সান জুর 'দ্য আর্ট অব ওয়ার'-এর যুগ থেকেই গোয়েন্দাবৃত্তি (Espionage) যেকোনো রাষ্ট্রের টিকে থাকা এবং যুদ্ধজয়ের প্রধান অদৃশ্য হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। তবে বিংশ শতাব্দীর দুই বিশ্বযুদ্ধ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর স্নায়ুযুদ্ধের (Cold War) দীর্ঘ ৪ দশকের পারমাণবিক অচলাবস্থা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করে।
আধুনিক বিশ্বে গোয়েন্দা তৎপরতা কেবল রণাঙ্গনের প্রতিপক্ষের অবস্থান জানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি রাজনৈতিক তথাকথিত 'রেজিম চেঞ্জ' (Regime Change), অর্থনৈতিক নাশকতা, সাইবার যুদ্ধ, ড্রোন হামলা এবং গোপন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অন্যতম হাতিয়ার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (CIA) এবং সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের কেজিবি (KGB)-এর মধ্যকার রক্তক্ষয়ী ছায়াযুদ্ধ বিশ্ব মানচিত্রের বহু দেশের ভাগ্য নির্ধারণ করেছে। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের মোসাদ (Mossad) তাদের নজিরবিহীন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও গুপ্তঘাতক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ভয় ও বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে।
দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতিতে ভারতের 'র' (RAW) এবং পাকিস্তানের 'আইএসআই' (ISI)-এর মধ্যকার পাঁচ দশকের শত্রুতা এই অঞ্চলের শান্তি ও নিরাপত্তার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে চলেছে। একই সাথে অ্যাংলো-স্যাক্সন পরাশক্তিগুলোর সম্মিলিত নজরদারি নেটওয়ার্ক 'ফাইভ আইজ' (Five Eyes) সমগ্র গ্রহের ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর নিরঙ্কুশ নজরদারি বজায় রেখেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে সমসাময়িক জাতীয় নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক রূপান্তরে ডিজিএফআই (DGFI), এনএসআই (NSI) এবং পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ (SB)-এর ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। গণতান্ত্রিক সুশাসন ও নাগরিক অধিকারের ভারসাম্য বজায় রেখে জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই একবিংশ শতাব্দীতে গোয়েন্দা ব্যবস্থার প্রধানতম চ্যালেঞ্জ।
২৫.১ গোয়েন্দা তথ্যের মৌলিক প্রকারভেদ ও পরিভাষা (The Tradecraft) #
আধুনিক গোয়েন্দা সংস্থাসমূহ মূলত তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের জন্য পাঁচটি মূল পদ্ধতি বা ডিসিপ্লিনের ওপর নির্ভর করে:
- হিউমিন্ট (HUMINT - Human Intelligence): মানব গুপ্তচর, ফিল্ড অপারেটিভ, কূটনীতিক ও সোর্সদের মাধ্যমে সংগৃহীত সরাসরি তথ্য। এটি গোয়েন্দা ইতিহাসের প্রাচীনতম রূপ (যেমন: সিআইএ বা মোসাদের ফিল্ড এজেন্ট)।
- সিগিন্ট (SIGINT - Signals Intelligence): ইলেকট্রনিক যোগাযোগ, রেডিও তরঙ্গ, মোবাইল নেটওয়ার্ক ও এনক্রিপ্টেড বার্তা ইন্টারসেপ্ট বা আড়িপাতার মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য। (প্রধান সংস্থা: যুক্তরাষ্ট্রের NSA, যুক্তরাজ্যের GCHQ, ইসরায়েলের Unit 8200)।
- জিওইন্ট / ইমিন্ট (GEOINT/IMINT - Geospatial / Imagery Intelligence): সামরিক কৃত্রিম উপগ্রহ (Spy Satellites), উচ্চ-নজরদারি বিমান (U-2 ড্রোন) ও এরিয়াল ফটোগ্রাফির মাধ্যমে প্রাপ্ত ছবি ও মানচিত্রভিত্তিক তথ্য।
- ওসিন্ট (OSINT - Open Source Intelligence): উন্মুক্ত পাবলিক ডোমেইন, সংবাদমাধ্যম, সোশ্যাল মিডিয়া, বাণিজ্যিক উপগ্রহ মানচিত্র এবং সরকারি রিপোর্ট বিশ্লেষণ করে প্রাপ্ত বৈধ গোয়েন্দা তথ্য।
- সাইবিন্ট (CYBINT / DNINT - Cyber / Digital Network Intelligence): হ্যাকিং, ম্যালওয়্যার, ট্রোজান ও স্পাইওয়্যার (যেমন: পেগাসাস স্পাইওয়্যার) ব্যবহার করে লক্ষ্যবস্তুর কম্পিউটার ও মোবাইল নেটওয়ার্ক থেকে সংগৃহীত ডিজিটাল ডেটা।
২৫.২ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সম্প্রদায় (US Intelligence Community) #
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সম্প্রদায় সর্বমোট ১৮টি পৃথক গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত, যার সার্বিক সমন্বয়ক হলেন ক্যাবিনেট মর্যাদাসম্পন্ন ডিরেক্টর অব ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স (DNI)। (৯/১১ হামলার গোয়েন্দা ব্যর্থতার পর ২০০৪ সালে এই পদ তৈরি করা হয়)।
১. সিআইএ (CIA - Central Intelligence Agency) #
- প্রতিষ্ঠা ও ইতিহাস: প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস. ট্রুম্যান কর্তৃক স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক 'জাতীয় নিরাপত্তা আইন ১৯৪৭' (National Security Act of 1947)-এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর পূর্বসূরি ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন বিখ্যাত গোয়েন্দা সংস্থা ওএসএস (Office of Strategic Services - OSS)।
- সদর দপ্তর: ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যের ফেয়ারফ্যাক্স কাউন্টির ল্যাংলি (Langley)-তে অবস্থিত 'জর্জ বুশ সেন্টার ফর ইন্টেলিজেন্স'।
- দায়িত্ব: এটি মূলত একটি স্বাধীন বেসামরিক বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা। যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের গোপন তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং রাষ্ট্রপতির নির্দেশে বিদেশে গোপন সামরিক বা রাজনৈতিক অভিযান (Covert Operations) পরিচালনা করে। মার্কিন অভ্যন্তরীণ তদন্ত করার কোনো আইনি কর্তৃত্ব সিআইএ-র নেই।
২. এফবিআই (FBI - Federal Bureau of Investigation) #
- প্রতিষ্ঠা: ১৯০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় (প্রথমে নাম ছিল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন)। ১৯২৪ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৪৮ বছর এর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ছিলেন প্রতাপশালী জে. এডগার হুভার (J. Edgar Hoover)।
- সদর দপ্তর: ওয়াশিংটন ডিসির পেনসিলভানিয়া অ্যাভিনিউতে অবস্থিত 'জে. এডগার হুভার বিল্ডিং'।
- দায়িত্ব: মার্কিন বিচার বিভাগের অধীনস্থ শীর্ষ অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও ফেডারেল অপরাধ তদন্ত সংস্থা। এটি মূলত অভ্যন্তরীণ কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স (বিদেশি গুপ্তচর দমন), অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসবাদ প্রতিরোধ এবং বড় ধরনের আর্থিক ও সাইবার অপরাধের তদন্ত করে।
৩. এনএসএ (NSA - National Security Agency) #
- প্রতিষ্ঠা: ১৯৫২ সালে প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যানের এক অতি-গোপন নির্দেশনায় প্রতিষ্ঠিত হয় (দীর্ঘদিন এর অস্তিত্ব গোপন থাকায় মজা করে একে বলা হতো "No Such Agency" বা "Never Say Anything" )।
- সদর দপ্তর: মেরিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের ফোর্ট মিড (Fort Meade)।
- দায়িত্ব: এটি মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের আওতাধীন বিশ্বের বৃহত্তম সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স (SIGINT) ও কোডব্রেকিং সংস্থা। সমগ্র বিশ্বের টেলিফোন কল, ইমেইল, ইন্টারনেট ট্রাফিক এবং স্যাটেলাইট কমিউনিকেশন মনিটর করে।
- এডওয়ার্ড স্নোডেন ফাঁস (২০১৩): এনএসএ-র চুক্তিভিত্তিক সাবেক প্রযুক্তিবিদ এডওয়ার্ড স্নোডেন ২০১৩ সালে এনএসএ-র সর্বগ্রাসী বৈশ্বিক নজরদারি প্রকল্প 'প্রিজম' (PRISM) এবং মিত্র দেশগুলোর রাষ্ট্রপ্রধানদের ফোনে আড়িপাতার লাখ লাখ গোপন নথি ফাঁস করে দেন।
২৫.৮ বাংলাদেশি গোয়েন্দা কাঠামো ও জাতীয় নিরাপত্তা #
বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব সুরক্ষায় একাধিক বেসামরিক ও সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা দায়িত্ব পালন করে থাকে:
১. ডিজিএফআই (DGFI - Directorate General of Forces Intelligence) #
- প্রতিষ্ঠা: ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে 'ডিরেক্টরেট অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স' (DFI) গঠিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালে এটিকে সম্প্রসারিত করে 'প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর' (DGFI)-এ রূপান্তর করা হয়।
- সদর দপ্তর: ঢাকা সেনানিবাস।
- দায়িত্ব: সশস্ত্র বাহিনীর জন্য কৌশলগত ও সামরিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, বৈদেশিক সামরিক হুমকি প্রতিহতকরণ এবং জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ে সরকারকে গোয়েন্দা পরামর্শ প্রদান। এর প্রধান হলেন মহাপরিচালক (Director General), যিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন কর্মরত মেজর জেনারেল পদমর্যাদার কর্মকর্তা।
২. এনএসআই (NSI - National Security Intelligence) #
- প্রতিষ্ঠা: ১৯৭২ সালে গঠিত হয়। এটি বাংলাদেশের প্রধান বেসামরিক বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা।
- সদর দপ্তর: সেগুনবাগিচা, ঢাকা।
- প্রশাসনিক অবস্থান: এনএসআই সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় (PMO)-এর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণাধীন। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশি দূতাবাসগুলোতে এবং দেশের প্রতিটি জেলায় এর নিজস্ব গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক রয়েছে। এর মহাপরিচালক (DG) হিসেবে সাধারণত সেনাবাহিনী থেকে প্রেষণে নিযুক্ত একজন মেজর জেনারেল দায়িত্ব পালন করেন।
৩. স্পেশাল ব্রাঞ্চ (SB - বিশেষ শাখা) #
- প্রতিষ্ঠা ও ঐতিহ্য: ১৮৮৭ সালে ব্রিটিশ আমলে অবিভক্ত বাংলায় গঠিত বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন গোয়েন্দা সংস্থা।
- সদর দপ্তর: মালিবাগ, ঢাকা।
- দায়িত্ব: এটি বাংলাদেশ পুলিশের শীর্ষ অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও বেসামরিক গোয়েন্দা শাখা। দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পর্যবেক্ষণ, ভিআইপি নিরাপত্তা এবং বহিরাগমন ও পাসপোর্ট ভেরিফিকেশন (ইমিগ্রেশন) পরিচালনা এর প্রধান দায়িত্ব। এর প্রধান হলেন একজন অ্যাডিশনাল আইজিপি (Additional IGP)।
৪. এনটিএমসি (NTMC - ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার) #
- বাংলাদেশের প্রধান আইনসম্মত টেলিযোগাযোগ আড়িপাতা ও সাইবার ট্র্যাকিং সংস্থা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ হয়ে বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী ও গোয়েন্দা সংস্থাকে ডিজিটাল নজরদারি সহায়তা প্রদান করে।
২৫.৯ ইতিহাস কাঁপানো বিখ্যাত গোপন গোয়েন্দা অভিযানসমূহ #
- অপারেশন ফিনালে (Operation Finale - ১৯৬০): দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসি হলোকাস্টের অন্যতম প্রধান পরিকল্পনাকারী অ্যাডলফ আইখম্যান আর্জেন্টিনার বুয়েনস এইরেসে নাম বদলে আত্মগোপন করেছিলেন। ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের এজেন্টরা তাঁকে সেখান থেকে গোপনে অপহরণ করে ইসরায়েলে নিয়ে আসে এবং বিচারের পর ফাঁসি কার্যকর করে।
- অপারেশন র্যাথ অব গড (Operation Wrath of God - ১৯৭২-১৯৭৯): ১৯৭২ সালের মিউনিখ অলিম্পিকে ১১ জন ইসরায়েলি ক্রীড়াবিদকে ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হত্যা করার পর ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মেয়ারের নির্দেশে মোসাদ ইউরোপজুড়ে জড়িত সমস্ত সন্ত্রাসীদের খুঁজে খুঁজে গুপ্তহত্যা চালায়।
- অপারেশন নেপচুন স্পিয়ার (Operation Neptune Spear - ২ মে ২০১১): দীর্ঘ এক দশক অনুসন্ধানের পর মার্কিন সিআইএ পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে আল-কায়েদা প্রধান ওসামা বিন লাদেনের সুরক্ষিত আস্তানা শনাক্ত করে। মার্কিন নেভি সিল (SEAL Team 6) হেলিকপ্টার অভিযান চালিয়ে লাদেনকে হত্যা করে এবং মরদেহ সাগরে নিমজ্জিত করে।
- অপারেশন জ্যাকপট (Operation Jackpot - ১৯৭১): বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নৌ-কমান্ডোদের দ্বারা পরিচালিত আত্মঘাতী আক্রমণ। ভারতীয় নৌ গোয়েন্দা সংস্থা ও মুক্তিবাহিনীর যৌথ পরিকল্পনায় চট্টগ্রাম ও মংলা সমুদ্রবন্দর এবং চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দরে একযোগে মাইন বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বহু রণতরী ও অস্ত্রবাহী জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়া হয়।
- স্টাক্সনেট সাইবার ওয়ার্ম (Stuxnet Cyber Attack - ২০১০): মার্কিন সিআইএ ও ইসরায়েলি মোসাদের যৌথ 'অপারেশন অলিম্পিক গেমস'-এর অংশ হিসেবে বিশ্বের প্রথম সামরিক গ্রেডের ম্যালওয়্যার 'স্টাক্সনেট' তৈরি করা হয়। এটি ইরানের নাতানজ পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্রের সিমেন্স সেন্ট্রিফিউজগুলোতে অনুপ্রবেশ করে প্রায় এক হাজার সেন্ট্রিফিউজ ধ্বংস করে এবং ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে কয়েক বছর পিছিয়ে দেয়।
- পেগাসাস স্পাইওয়্যার প্রজেক্ট (Pegasus Project - ২০২১): ইসরায়েলি বেসরকারি সাইবার নজরদারি প্রতিষ্ঠান এনএসও গ্রুপ (NSO Group) কর্তৃক উদ্ভাবিত মিলিটারি গ্রেডের স্পাইওয়্যার 'পেগাসাস'। কোনো লিংকে ক্লিক ছাড়াই (Zero-Click Exploit) এটি যেকোনো স্মার্টফোনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ক্যামেরা, মাইক্রোফোন ও সমস্ত মেসেজ রেকর্ড করতে পারে। বিশ্বের অর্ধশতাধিক দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, বিরোধী রাজনীতিবিদ, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ও সাংবাদিকদের ফোনে পেগাসাস নজরদারির প্রমাণ ফাঁস হয়ে বৈশ্বিক ক্ষোভের জন্ম দেয়।
২৫.১০ গোয়েন্দা তদারকি, জবাবদিহিতা ও গণতান্ত্রিক শাসন (Intelligence Oversight) #
১. চার্চ কমিটি ও আধুনিক আইনি সংস্কার (Church Committee - ১৯৭৫) #
- ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারি এবং সিআইএ কর্তৃক মার্কিন নাগরিকদের ওপর বেআইনি আড়িপাতা ও বিদেশি নেতাদের হত্যার চেষ্টার প্রমাণ প্রকাশের পর ১৯৭৫ সালে সিনেটর ফ্রাঙ্ক চার্চের নেতৃত্বে বিখ্যাত 'চার্চ কমিটি' গঠিত হয়।
- এর সুপারিশে মার্কিন কংগ্রেস গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ওপর নজরদারির জন্য স্থায়ী গোয়েন্দা কমিটি এবং বিচারিক অনুমোদনের জন্য FISA কোর্ট (Foreign Intelligence Surveillance Court) গঠন করে। আধুনিক আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থায় নীতি নির্ধারিত হয় যে কোনো গোয়েন্দা সংস্থাই আইনের ঊর্ধ্বে নয়।
২. বাংলাদেশে গোয়েন্দা সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা #
- বাংলাদেশের সংবিধানে (অনুচ্ছেদ ৪৩) নাগরিকদের চিঠিপত্র ও যোগাযোগের গোপনীয়তা রক্ষার মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।
- জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থাসমূহ যাতে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমন বা বেআইনি নজরদারিতে ব্যবহৃত না হয়, সেজন্য সংসদীয় কমিটি এবং স্বাধীন জুডিশিয়াল ওভারসাইটের প্রয়োজনীয়তার ওপর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনসমূহ গুরুত্বারোপ করে আসছে।
📊 একনজরে মাস্টার সিন্থেসিস ও তুলনা সারণি (Master Synthesis Table) #
| গোয়েন্দা সংস্থা | দেশ | সদর দপ্তর | প্রতিষ্ঠার সাল | নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ | বিশেষ পরিচিতি ও অপারেশন |
|---|---|---|---|---|---|
| CIA | মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র | ল্যাংলি, ভার্জিনিয়া | ১৯৪৭ | সরাসরি প্রেসিডেন্ট / DNI | বিশ্বের প্রধান বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা; অপারেশন নেপচুন স্পিয়ার। |
| FBI | মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র | ওয়াশিংটন ডিসি | ১৯০৮ | মার্কিন বিচার বিভাগ | শীর্ষ অভ্যন্তরীণ কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স ও ফেডারেল অপরাধ তদন্ত। |
| NSA | মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র | ফোর্ট মিড, মেরিল্যান্ড | ১৯৫২ | মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ | সিগিন্ট ও বৈশ্বিক নজরদারি নেটওয়ার্ক; প্রিজম প্রোগ্রাম (স্নোডেন ফাঁস)। |
| MI6 (SIS) | যুক্তরাজ্য | ভক্সহল ক্রস, লন্ডন | ১৯০৯ | ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় | জেমস বন্ড খ্যাতি; প্রধানকে "C" নামে সম্বোধন করা হয়। |
| মোসাদ | ইসরায়েল | তেল আবিব | ১৯৪৯ | ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর | লক্ষ্যভ্রষ্ট না হওয়া গুপ্তহত্যা; অপারেশন ফিনালে ও র্যাথ অব গড। |
| FSB | রাশিয়া | লুবিয়াঙ্কা, মস্কো | ১৯৯৫ | রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট | কেজিবির অভ্যন্তরীণ প্রধান উত্তরসূরি; কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স। |
| RAW | ভারত | নয়াদিল্লি | ১৯৬৮ | প্রধানমন্ত্রীর ক্যাবিনেট সচিবালয় | প্রতিষ্ঠাতা আর. এন. কাও; ১৯৭১ মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিবাহিনী সহায়তা। |
| ISI | পাকিস্তান | ইসলামাবাদ | ১৯৪৮ | পাকিস্তান সেনাবাহিনী | মেজর জেনারেল রবার্ট কথম রূপকার; আফগান মুজাহিদীন সমন্বয়। |
| DGFI | বাংলাদেশ | ঢাকা সেনানিবাস | ১৯৭৭ | প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় | সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান কৌশলগত সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা। |
| NSI | বাংলাদেশ | সেগুনবাগিচা, ঢাকা | ১৯৭২ | সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় | বাংলাদেশের প্রধান বেসামরিক বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা। |
| কোড / ছন্দ | পূর্ণরূপ / মূল ভাবার্থ | জড়িত বিষয় / ক্ষেত্র | পরীক্ষার জন্য যেভাবে মনে রাখবেন |
|---|---|---|---|
| সিআইএ বাইরে, এফবিআই ঘরে | CIA বৈদেশিক গোয়েন্দা, FBI অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা | মার্কিন গোয়েন্দা বিভাজন | পরীক্ষায় এখতিয়ার সংক্রান্ত বিভ্রান্তি দূর করার সবচেয়ে সহজ কৌশল। |
| ফাইভ আইজ ৫ | US, UK, Canada, Australia, New Zealand | ফাইভ আইজ (FVEY) জোট | অ্যাংলো-স্যাক্সন পাঁচ মিত্র দেশের তালিকা। |
| মিউনিখে র্যাথ অব গড | ১৯৭২ মিউনিখ হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধে মোসাদের অভিযান | মোসাদের বিখ্যাত অপারেশন | অপারেশন ও সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থার মেলবন্ধন। |
| ১৯৬৮-তে কাও-এর র | ১৯৬৮ সালে রামেশ্বর নাথ কাও কর্তৃক RAW প্রতিষ্ঠা | ভারতের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা | প্রতিষ্ঠা সাল ও প্রতিষ্ঠাতা প্রধানকে মনে রাখার সূত্র। |
| এমআই৬ 'C' | MI6 প্রধানকে "C" কোডে ডাকা হয় | ব্রিটিশ গোয়েন্দা ঐতিহ্য | ব্রিটিশ গোয়েন্দা প্রধানের একক কোড মনে রাখার কৌশল। |
| এনএসআই সেগুনবাগিচা, ডিজিএফআই সেনানিবাস | NSI সিভিলিয়ান PMO-এর অধীন, DGFI মিলিটারি ক্যান্টনমেন্টে | বাংলাদেশের দুই প্রধান গোয়েন্দা সদর দপ্তর | চাকরির পরীক্ষায় সদর দপ্তরের অবস্থান নির্ভুল রাখার টেকনিক। |