টপিক 07: অর্থনৈতিক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান (Bretton Woods)
টপিক ০৭: অর্থনৈতিক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান (Bretton Woods, IMF, World Bank Group, WTO, ADB, AIIB, NDB) #
🌐 অধ্যায় পরিচিতি ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট (Chapter Prologue: বিষয়টি কী ও কেন) #
আন্তর্জাতিক আর্থিক ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসমূহ আধুনিক বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক অর্থনীতির (International Political Economy - IPE) অবিচ্ছেদ্য চালিকাশক্তি। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় নিছক সামরিক সক্ষমতার চেয়েও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, নিরবচ্ছিন্ন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অবাধ প্রবাহ এবং বহুপাক্ষিক উন্নয়ন অর্থায়নের সুযোগ একটি রাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক মর্যাদার কেন্দ্রীয় নিয়ামক হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ পর্যন্ত বিশ্বে কোনো বিধিবদ্ধ বহুপাক্ষিক অর্থনৈতিক শাসনব্যবস্থা (Multilateral Economic Governance) বিদ্যমান ছিল না।
মহামন্দা ও ব্রেটন উডস ব্যবস্থার ঐতিহাসিক অনিবার্যতা #
১৯২৯ সালের অক্টোবরে নিউ ইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জের আকস্মিক ধসের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে সূচিত হয় ‘মহামন্দা’ (The Great Depression, ১৯২৯-১৯৩৯)। এই নজিরবিহীন আর্থিক বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা ভেঙে পড়ে এবং বিশ্বজুড়ে চরম অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ ও বাণিজ্যিক সংরক্ষণবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক প্রবর্তিত কুখ্যাত ‘স্মুট-হলি শুল্ক আইন’ (Smoot-Hawley Tariff Act, ১৯৩০) বিশ্বব্যাপী প্রতিশোধমূলক শুল্কযুদ্ধ উস্কে দেয়, যার ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ (৬৬%) হ্রাস পায়। বিভিন্ন দেশ তাদের মুদ্রার প্রতিযোগিতামূলক অবমূল্যায়ন (Beggar-thy-neighbour policies) ঘটিয়ে স্বর্ণমান (Gold Standard) পরিত্যাগ করে, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অর্থনৈতিক অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে বিশ্বনেতারা উপলব্ধি করেন যে, স্থায়ী বৈশ্বিক শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সহযোগিতার একটি মজবুত প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি অপরিহার্য। এই উপলব্ধির ঐতিহাসিক ফসলই হলো ১৯৪৪ সালের ব্রেটন উডস সম্মেলন এবং পরবর্তীকালে গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানমালা।
৭.১ ব্রেটন উডস সম্মেলন (১৯৪৪) ও আধুনিক বিশ্ব অর্থব্যবস্থার ঐতিহাসিক পটভূমি #
| 🏛️ ঐতিহাসিক ডাটা কার্ড: ব্রেটন উডস সম্মেলন (Bretton Woods Conference) |
|---|
| • আনুষ্ঠানিক নাম: United Nations Monetary and Financial Conference (জাতিসংঘ মুদ্রা ও আর্থিক সম্মেলন)। |
| • সময়কাল ও স্থান: ১ থেকে ২২ জুলাই ১৯৪৪; মাউন্ট ওয়াশিংটন হোটেল, ব্রেটন উডস, নিউ হ্যাম্পশায়ার, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। |
| • অংশগ্রহণকারী: ৪৪টি মিত্র দেশের ৭৩০ জন প্রতিনিধি ও অর্থনীতিবিদ। |
| • বুদ্ধিবৃত্তিক স্থপতিদ্বয়: জন মেনার্ড কেইনস (যুক্তরাজ্য) এবং হ্যারি ডেক্সটার হোয়াইট (যুক্তরাষ্ট্র)। |
| • সম্মেলনের প্রত্যক্ষ ফসল: আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) ও পুনর্গঠন ও উন্নয়নের জন্য আন্তর্জাতিক ব্যাংক (IBRD/World Bank)। |
| • ব্রেটন উডস মুদ্রা ব্যবস্থা: স্বর্ণমান ব্যবস্থা (Gold Standard: 1 আউন্স স্বর্ণ = $35 মার্কিন ডলার)। |
| • ব্যবস্থার অবসান: ১৫ আগস্ট ১৯৭১ (মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন কর্তৃক 'নিক্সন শক')। |
কেইনস বনাম হোয়াইট বিতর্ক #
সম্মেলনে মিত্রশক্তির দুটি বৃহৎ পরাশক্তির প্রধান তাত্ত্বিকদের মধ্যে গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়:
- জন মেনার্ড কেইনস (John Maynard Keynes, যুক্তরাজ্য): তিনি একটি আন্তর্জাতিক ক্লিয়ারিং ইউনিয়ন (ICU) গঠনের এবং 'ব্যাঙ্কর' (Bancor) নামক একটি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক রিজার্ভ মুদ্রা চালুর প্রস্তাব করেন, যাতে কোনো একক দেশের জাতীয় মুদ্রা বৈশ্বিক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে।
- হ্যারি ডেক্সটার হোয়াইট (Harry Dexter White, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র): মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন বিশাল স্বর্ণভাণ্ডার (বিশ্বের মোট আর্থিক স্বর্ণের প্রায় ৭০%) এবং শিল্প উৎপাদনের একচ্ছত্র ক্ষমতার সুযোগ নিয়ে তিনি মার্কিন ডলারকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন। শেষ পর্যন্ত হোয়াইটের মার্কিন ডলার-কেন্দ্রিক প্রস্তাবই সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।
স্বর্ণমান ও ১৯৭১ সালের 'নিক্সন শক' (Nixon Shock) #
ব্রেটন উডস চুক্তির মূল শর্ত ছিল মার্কিন ডলারকে স্বর্ণের বিপরীতে নোঙর (peg) করা—প্রতি আউন্স স্বর্ণের সরকারি মূল্য নির্ধারিত হয় ৩৫ মার্কিন ডলার ($1\text{ oz Gold} = $35$)। সদস্য রাষ্ট্রগুলো তাদের জাতীয় মুদ্রার মান ডলারের সাথে নির্দিষ্ট বিনিময় হারে স্থির রাখতে বাধ্য ছিল।
কিন্তু ১৯৬০-এর দশকে ভিয়েতনাম যুদ্ধ এবং মার্কিন অভ্যন্তরীণ ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বাজারে ডলারের সরবরাহ ব্যাপক বৃদ্ধি পায়, বিপরীতে ফোর্ট নক্সে স্বর্ণের রিজার্ভ দ্রুত হ্রাস পেতে থাকে। আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের অতি-সরবরাহ রোধে এবং ফরাসি প্রেসিডেন্ট দ্য গলের নেতৃত্বে বৈদেশিক ডলারকে স্বর্ণে রূপান্তরের প্রবল চাপের মুখে ১৫ আগস্ট ১৯৭১ মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন একতরফাভাবে ডলারের সাথে স্বর্ণের নির্ধারিত রূপান্তরযোগ্যতা বাতিল ঘোষণা করেন। অর্থনৈতিক ইতিহাসে এটি 'নিক্সন শক' (Nixon Shock) নামে পরিচিত। এর ফলে ব্রেটন উডস ব্যবস্থার আনুষ্ঠানিক পতন ঘটে এবং বিশ্ব অর্থনীতি স্থির বিনিময় হার থেকে 'ভাসমান মুদ্রা বিনিময় হার' (Floating Exchange Rate) ব্যবস্থায় প্রবেশ করে।
৭.২ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF): কাঠামো, এসডিআর ও কার্যক্রম #
| 🏛️ প্রাতিষ্ঠানিক ডাটা কার্ড: আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) |
|---|
| • প্রতিষ্ঠার ভিত্তি ও তারিখ: ব্রেটন উডস চুক্তি অনুযায়ী ২৭ ডিসেম্বর ১৯৪৫ (আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু: ১ মার্চ ১৯৪৭)। |
| • সদর দফতর: ওয়াশিংটন ডিসি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। |
| • মোট সদস্য রাষ্ট্র: ১৯০টি (সর্বশেষ সদস্য: পাইরেনিজ পর্বতমালার ক্ষুদ্র দেশ অ্যান্ডোরা, ১৬ অক্টোবর ২০২০)। |
| • শীর্ষ নেতৃত্ব: ব্যবস্থাপনা পরিচালক (Managing Director) — ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা (বুলগেরিয়া; আইএমএফের দ্বিতীয় নারী এমডি)। |
| • ফার্স্ট ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (FDMD): গীতা গোপীনাথ (ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন অর্থনীতিবিদ)। |
| • প্রধান ম্যান্ডেট: আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, লেনদেনের ভারসাম্য (Balance of Payments - BoP) সংকট মোকাবেলা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক সংস্কার তদারকি। |
| • ঋণের মেয়াদ: স্বল্প ও মধ্যম মেয়াদি শর্তযুক্ত ঋণ (Policy Conditionality বা Structural Adjustment)। |
১. আইএমএফ কোটা ব্যবস্থা (IMF Quotas) ও ভোটিং ক্ষমতা #
আইএমএফ-এ প্রতিটি সদস্য দেশের ভোটিং ক্ষমতা নির্ধারিত হয় তাদের নির্ধারিত 'কোটা' (Quota)-র ওপর ভিত্তি করে। এই কোটা চারটি অর্থনৈতিক সূচকের সমন্বয়ে গঠিত:
- জিডিপি (GDP): ৫০% গুরুত্ব (Gross Domestic Product)
- উন্মুক্ততা (Openness): ৩০% গুরুত্ব (বাণিজ্য ও চলতি হিসাবের ব্যাপ্তি)
- অর্থনৈতিক পরিবর্তনশীলতা (Economic Variability): ১৫% গুরুত্ব (আর্থিক প্রবাহের অস্থিরতা)
- আন্তর্জাতিক রিজার্ভ (Official Reserves): ৫% গুরুত্ব
কোটা অনুযায়ী সদস্য দেশকে তহবিলে চাঁদা প্রদান করতে হয় এবং সেই অনুপাতে ভোটিং শেয়ার ও ঋণ গ্রহণের সীমা নির্ধারিত হয়।
- মার্কিন ভেটো ক্ষমতা: আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের যেকোনো নীতিগত ও কাঠামোগত মৌলিক সংস্কারের জন্য ৮৫% সুপার-মেজরিটি (Supermajority) ভোটের প্রয়োজন হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একক ভোটিং শেয়ার ১৬.৫০%। ফলে যুক্তরাষ্ট্র একা কোনো সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করলেই প্রস্তাবটি বাতিল হয়ে যায়—যা যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতিষ্ঠানে কার্যকর একক ভেটো ক্ষমতার অধিকারী করেছে।
২. বিশেষ উত্তোলন অধিকার বা এসডিআর (Special Drawing Rights - SDR) #
আন্তর্জাতিক লেনদেনে ডলার ও স্বর্ণের ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যে ১৯৬৯ সালে আইএমএফ নিজস্ব সম্পূরক আন্তর্জাতিক রিজার্ভ সম্পদ হিসেবে এসডিআর (SDR) প্রবর্তন করে। এসডিআর কোনো মুদ্রা বা কাগুজে নোট নয়, এটি আইএমএফ সদস্যদের মধ্যে বিনিময়যোগ্য একটি সম্পূরক রিজার্ভ দাবি। এর অ্যাকাউন্টিং কোড XDR এবং একে রূপক অর্থে ‘কাগজের সোনা’ (Paper Gold) বলা হয়।
📌 ইউয়ান অন্তর্ভুক্তি মাইলফলক: ২০১৬ সালের ১ অক্টোবর চীনা রেনমিনবি (ইউয়ান) এসডিআর বাস্কেটের পঞ্চম মুদ্রা হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হয়, যা চীনের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে ওঠার অন্যতম স্বীকৃতি।
৩. আইএমএফ-এর প্রধান প্রকাশনাসমূহ ও বাংলাদেশ প্রসঙ্গ #
- ফ্ল্যাগশিপ রিপোর্টসমূহ:
- World Economic Outlook (WEO) — বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস দেয়।
- Global Financial Stability Report (GFSR) — ব্যাংকিং ও তারল্য ঝুঁকি বিশ্লেষণ।
- Fiscal Monitor — সরকারি ঋণ ও বাজেট ঘাটতি পর্যালোচনা।
- বাংলাদেশ প্রসঙ্গ: ১৯৭২ সালের ১৭ আগস্ট বাংলাদেশ আইএমএফ-এর সদস্যপদ লাভ করে। ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি আইএমএফ বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সুরক্ষার জন্য ৪.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঋণ প্যাকেজ (ECF, EFF ও RSF-এর আওতায়) অনুমোদন করে।
📊 আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) বনাম বিশ্বব্যাংক (World Bank) তুলনামূলক পার্থক্য ছক #
| তুলনার মাপকাঠি | আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) | বিশ্বব্যাংক গ্রুপ (World Bank Group) |
|---|---|---|
| মূল ম্যান্ডেট | আন্তর্জাতিক আর্থিক স্থিতিশীলতা ও মুদ্রার মান নিয়ন্ত্রণ। | দারিদ্র্য বিমোচন ও টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন। |
| ঋণের প্রধান ক্ষেত্র | লেনদেনের ভারসাম্য (BoP) ঘাটতি ও রিজার্ভ সংকট দূরীকরণ। | অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও জলবায়ু প্রকল্প। |
| ঋণের মেয়াদ | মূলত স্বল্প ও মধ্যম মেয়াদি ঋণ। | মূলত দীর্ঘমেয়াদি (২০ থেকে ৩৮ বছর) প্রকল্প ঋণ। |
| নেতৃত্বের প্রথা | প্রথাগতভাবে একজন ইউরোপীয় নাগরিক প্রধান হন। | প্রথাগতভাবে একজন মার্কিন নাগরিক প্রধান হন। |
| সদস্য দেশ | ১৯০টি (বিশ্বব্যাংকের সদস্য হতে হলে আগে IMF সদস্য হতে হয়)। | ১৯০টি দেশ (আইবিআরডি অনুযায়ী)। |
৭.৩ বিশ্বব্যাংক গ্রুপ (World Bank Group - WBG): ৫টি অনন্য প্রতিষ্ঠান #
| 🏛️ প্রাতিষ্ঠানিক ডাটা কার্ড: বিশ্বব্যাংক গ্রুপ (World Bank Group) |
|---|
| • প্রতিষ্ঠা ও কার্যক্রম: ২৭ ডিসেম্বর ১৯৪৫ প্রতিষ্ঠিত; ২৫ জুন ১৯৪৬ আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু। |
| • সদর দফতর: ১৮১৮ এইচ স্ট্রিট এনডব্লিউ, ওয়াশিংটন ডিসি, যুক্তরাষ্ট্র। |
| • মোট সদস্য: ১৯০টি দেশ (সর্বশেষ সদস্য: অ্যান্ডোরা, ২০২০)। |
| • শীর্ষ নেতৃত্ব: প্রেসিডেন্ট — অজয় বাঙ্গা (Ajay Banga) (ভারতীয় বংশোদ্ভূত ১৪তম প্রেসিডেন্ট; দায়িত্ব গ্রহণ: ২ জুন ২০২৩)। |
| • চিফ ইকোনমিস্ট ও সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট: ইন্দরমিত গিল (Indermit Gill)। |
| • শীর্ষ ভোটিং ক্ষমতা: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (১৫.৮% ভোটিং শেয়ার নিয়ে কার্যকর ভেটো ক্ষমতার অধিকারী)। |
| • সাংগঠনিক পরিচয়: বিশ্বব্যাংক গ্রুপ পাঁচটি স্বতন্ত্র কিন্তু সমন্বিত প্রতিষ্ঠানের একটি বহুপাক্ষিক কনসোর্টিয়াম। |
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ৫টি অঙ্গসংগঠনের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ #
১. IBRD (International Bank for Reconstruction and Development) #
- প্রতিষ্ঠা: ১৯৪৪ (কার্যক্রম ১৯৪৬); সদস্য: ১৯০টি।
- ম্যান্ডেট: মধ্যম আয়ের ও ক্রেডিট-যোগ্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর সরকারগুলোকে টেকসই উন্নয়ন ও অবকাঠামো নির্মাণের জন্য বাজারভিত্তিক সুদে ঋণ প্রদান। সাধারণ অর্থে 'বিশ্বব্যাংক' বলতে IBRD ও IDA-এর যৌথ কার্যক্রমকে বোঝানো হয়।
২. IDA (International Development Association) #
- প্রতিষ্ঠা: ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৬০; সদস্য: ১৭৪টি দেশ।
- উপাধি: বিশ্বব্যাংকের 'সহজ শর্তের ঋণদানকারী জানালা' (Soft Loan Window)।
- বৈশিষ্ট্য: এটি বিশ্বের দরিদ্রতম এবং নিম্ন আয়ের দেশগুলোকে অতি সামান্য সার্ভিস চার্জে (০.৭৫%) ৩০ থেকে ৩৮ বছর মেয়াদি সুদমুক্ত ঋণ ও অনুদান দিয়ে থাকে। ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে ৫ থেকে ১০ বছরের গ্রেস পিরিয়ড প্রদান করা হয়।
- বাংলাদেশ প্রসঙ্গ: ১৯৭২ সালের ১৭ আগস্ট বাংলাদেশ আইডিএ-র সদস্য হয়। বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে আইডিএ-র অন্যতম শীর্ষ ঋণগ্রহীতা দেশ।
৩. IFC (International Finance Corporation) #
- প্রতিষ্ঠা: ২০ জুলাই ১৯৫৬; সদস্য: ১৮৬টি দেশ।
- ম্যান্ডেট: উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সরাসরি বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ ও ঋণ প্রদান করা। এটি সদস্য রাষ্ট্রের সরকারি গ্যারান্টি ছাড়াই সরাসরি বাণিজ্যিক ও শিল্প প্রতিষ্ঠানে ইকুইটি শেয়ার ও ঋণ প্রদান করতে পারে।
৪. MIGA (Multilateral Investment Guarantee Agency) #
- প্রতিষ্ঠা: ১২ এপ্রিল ১৯৮৮; সদস্য: ১৮২টি দেশ।
- ম্যান্ডেট: উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (FDI) উৎসাহিত করার জন্য বিনিয়োগকারীদের অ-বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক ঝুঁকি (Non-commercial Risks) যেমন—যুদ্ধ, গৃহযুদ্ধ, রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ (Expropriation), মুদ্রা রূপান্তরের প্রতিবন্ধকতা ইত্যাদির বিরুদ্ধে আর্থিক গ্যারান্টি ও বীমা সুরক্ষা প্রদান করা।
৫. ICSID (International Centre for Settlement of Investment Disputes) #
- প্রতিষ্ঠা: ১৪ অক্টোবর ১৯৬৬; সদস্য: ১৬৫টি দেশ।
- ম্যান্ডেট: বিদেশি বেসরকারি বিনিয়োগকারী এবং সদস্য রাষ্ট্রের সরকারের মধ্যে বিনিয়োগ সংক্রান্ত চুক্তিগত সংঘাত ও বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য নিরপেক্ষ সালিশি ও মধ্যস্থতা আদালত হিসেবে কাজ করা।
বিশ্বব্যাংকের প্রথা, প্রতিবেদন ও সাম্প্রতিক সংস্কার #
- অঘোষিত নেতৃত্ব প্রথা: ব্রেটন উডস সম্মেলনের পর থেকেই একটি অলিখিত কূটনৈতিক প্রথা চালু রয়েছে—বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট সর্বদা মার্কিন নাগরিক হবেন (যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক মনোনীত) এবং আইএমএফ-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক সর্বদা ইউরোপীয় নাগরিক হবেন।
- ফ্ল্যাগশিপ প্রকাশনাসমূহ:
- World Development Report (WDR) — প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট উন্নয়নশীল ইস্যুর ওপর প্রকাশিত মূল বার্ষিক প্রতিবেদন।
- Global Economic Prospects (GEP) — বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও ঋণ সংকটের বিশদ মূল্যায়ন।
- ডুইং বিজনেস রিপোর্টের অবসান ও B-READY: চীনের ডেটা ম্যানিপুলেশন কেলেঙ্কারির অভিযোগে বিশ্বব্যাংক ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে তাদের বহুল প্রচারিত Doing Business Report স্থায়ীভাবে বাতিল ঘোষণা করে। এর বিকল্প হিসেবে ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে টেকসই ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিবেশ মূল্যায়নে বিশ্বব্যাংক নতুন ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প 'বিজনেস রেডি' (B-READY / Business Ready) চালু করে।
৭.৪ শুল্ক ও বাণিজ্য বিষয়ক সাধারণ চুক্তি (GATT) থেকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (WTO) #
হাভানা চার্টার ও গ্যাট (GATT) প্রতিষ্ঠা #
ব্রেটন উডস সম্মেলনে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নিয়মকানুন পরিচালনার জন্য International Trade Organization (ITO) গঠনের প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল। ১৯৪৮ সালে কিউবার রাজধানী হাভানায় ৫৩টি দেশ হাভানা চার্টার (Havana Charter) স্বাক্ষর করলেও মার্কিন সিনেট ITO অনুমোদন করতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে ITO আলোর মুখ দেখেনি।
আইটিও ব্যর্থ হলেও শুল্ক হ্রাস ও অবাধ বাণিজ্য চালুর লক্ষ্যে ১৯৪৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর করা হয় 'শুল্ক ও বাণিজ্য বিষয়ক সাধারণ চুক্তি' (GATT - General Agreement on Tariffs and Trade)। এটি ১৯৪৭ সালের ৩০ অক্টোবর জেনেভায় ২৩টি প্রতিষ্ঠাতা দেশ স্বাক্ষর করেছিল। গ্যাট কোনো সংস্থা ছিল না, এটি ছিল একটি বহুপাক্ষিক চুক্তি।
উরুগুয়ে রাউন্ড ও ডব্লিউটিও প্রতিষ্ঠা #
গ্যাটের অধীনে মোট ৮টি বহুপাক্ষিক বাণিজ্য আলোচনা (Trade Rounds) অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে যুগান্তকারী ছিল অষ্টম রাউন্ড—উরুগুয়ে রাউন্ড (Uruguay Round, ১৯৮৬–১৯৯৪)। উরুগুয়ের পুন্তা দেল এস্তেতে শুরু হওয়া এই রাউন্ডের অচলাবস্থা নিরসনে গ্যাট মহাসচিব আর্থার ডাঙ্কেল একটি রূপরেখা দেন, যা 'ডাঙ্কেল ড্রাফট' (Dunkel Draft) নামে পরিচিত।
অবশেষে ১৫ এপ্রিল ১৯৯৪ মরক্কোর মারাক্কেশ শহরে ১২৩টি দেশের প্রতিনিধিরা ঐতিহাসিক 'মারাক্কেশ চুক্তি' (Marrakesh Agreement) স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তির আওতায় ১৯৯৫ সালের ১ জানুয়ারি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (WTO - World Trade Organization) আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং গ্যাট বিলুপ্ত হয়ে ডব্লিউটিও-র সাধারণ পণ্য বাণিজ্য চুক্তিতে রূপান্তরিত হয়।
| 🏛️ প্রাতিষ্ঠানিক ডাটা কার্ড: বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (WTO) |
|---|
| • প্রতিষ্ঠা ও কার্যকারিতা: ১ জানুয়ারি ১৯৯৫ (মারাক্কেশ চুক্তির মাধ্যমে)। |
| • সদর দফতর: সেন্টার উইলিয়াম রাপার্ড (Centre William Rappard), জেনেভা, সুইজারল্যান্ড। |
| • মোট সদস্য রাষ্ট্র: ১৬৬টি (সর্বশেষ সদস্য: ১৬৫তম কোমোরোস ও ১৬৬তম তিমুর-লেস্তে, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪-এ MC13 আবুধাবিতে অনুমোদিত)। |
| • শীর্ষ নেতৃত্ব: মহাপরিচালক (Director-General) — ড. এনগোজি ওকোনজো-ইওয়ালা (Ngozi Okonjo-Iweala) (নাইজেরিয়া; ডব্লিউটিওর প্রথম নারী এবং প্রথম আফ্রিকান মহাপরিচালক)। |
| • সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরাম: মিনিস্টেরিয়াল কনফারেন্স (প্রতি দুই বছরে অন্তত একবার অনুষ্ঠিত হয়)। |
| • ১৩তম মিনিস্টেরিয়াল কনফারেন্স (MC13): ২৬-২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪; আবুধাবি, সংযুক্ত আরব আমিরাত। |
| • ১৪তম মিনিস্টেরিয়াল কনফারেন্স (MC14): ২০২৬ সালে ক্যামেরুনের ইয়াউন্দেতে অনুষ্ঠিত হবে। |
ডব্লিউটিও-এর ৩টি স্তম্ভ ও মৌলিক নীতিসমূহ #
ডব্লিউটিও প্রধানত তিনটি বহুপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির সমন্বয়ে পরিচালিত হয়:
- GATT (General Agreement on Tariffs and Trade): পণ্য বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ।
- GATS (General Agreement on Trade in Services): ব্যাংকিং, আইটি, পর্যটনসহ সেবা বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ।
- TRIPS (Trade-Related Aspects of Intellectual Property Rights): পেটেন্ট, কপিরাইট ও মেধা সম্পদ সুরক্ষা।
ডব্লিউটিও-এর মূল কার্যপ্রণালী ও নীতি #
- ১. মোস্ট ফেভার্ড নেশন (MFN - Most Favoured Nation Rule): চুক্তির ১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সদস্য রাষ্ট্র অন্য কোনো দেশকে বাণিজ্যে বিশেষ শুল্ক ছাড় দিলে, সেই একই সুবিধা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডব্লিউটিও-র অন্য সকল সদস্য রাষ্ট্রকেও প্রদান করতে হবে। অর্থাৎ বাণিজ্যে কোনো বৈষম্য করা যাবে না।
- ২. জাতীয় আচরণ (National Treatment Principle): অভ্যন্তরীণ বাজারে আমদানিকৃত পণ্য এবং দেশীয় পণ্যের মধ্যে কোনো প্রকার কর বা আইনি বৈষম্য করা যাবে না।
- ৩. বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা (Dispute Settlement Mechanism - DSM): ডব্লিউটিও-র Dispute Settlement Body (DSB) এবং আপিল বডি (Appellate Body) আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিরোধ সালিশ ও নিষ্পত্তিতে কার্যকর আন্তর্জাতিক আদালত হিসেবে কাজ করে।
- বাংলাদেশ প্রসঙ্গ: বাংলাদেশ ১৯৭২ সাল থেকে গ্যাট-এর সদস্য ছিল এবং ১৯৯৫ সালের ১ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠার প্রথম দিনেই প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে ডব্লিউটিও-তে যোগদান করে। স্বল্পোন্নত দেশ (LDC) হিসেবে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন যাবৎ শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাজার সুবিধা (DFQF - Duty-Free Quota-Free) উপভোগ করে আসছে।
৭.৫ আঞ্চলিক ও উদীয়মান উন্নয়ন ব্যাংকসমূহ (ADB, AIIB ও NDB) #
পশ্চিমা আধিপত্যাধীন বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর বিকল্প ও সম্পূরক হিসেবে এশিয়া ও বৈশ্বিক দক্ষিণের অবকাঠামো অর্থায়নের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তিনটি প্রধান বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাংক:
১. এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (Asian Development Bank - ADB) #
- প্রতিষ্ঠা: ১৯ ডিসেম্বর ১৯৬৬ (কার্যক্রম শুরু: ১৯ ডিসেম্বর ১৯৬৬)।
- সদর দফতর: ম্যানিলা, ফিলিপাইন।
- মোট সদস্য: ৬৮টি দেশ (৪৯টি এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের এবং ১৯টি অ-আঞ্চলিক দেশ)।
- শীর্ষ নেতৃত্ব: প্রেসিডেন্ট — মাসাতসুগু আসাকাওয়া (Masatsugu Asakawa)। ঐতিহাসিকভাবে এডিবির প্রেসিডেন্ট সর্বদা একজন জাপানি নাগরিক হয়ে থাকেন।
- ভোটিং ক্ষমতা ও অর্থায়ন: এডিবির দুই শীর্ষ শেয়ারহোল্ডার হলো জাপান (১৫.৫৭%) এবং যুক্তরাষ্ট্র (১৫.৫৭%)।
- ফ্ল্যাগশিপ প্রতিবেদন: Asian Development Outlook (ADO)।
- বাংলাদেশ প্রসঙ্গ: ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ সদস্যপদ লাভ করে। যমুনা বঙ্গবন্ধু সেতু, ঢাকা মেট্রো রেল ও বিদ্যুৎ খাতে এডিবি বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ নমনীয় ঋণদাতা।
২. এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (AIIB - Asian Infrastructure Investment Bank) #
- পটভূমি ও উদ্যোগ: ২০১৩ সালের অক্টোবরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং কর্তৃক বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI)-এর অবকাঠামোগত অর্থায়নের লক্ষ্যে প্রস্তাবিত হয়।
- প্রতিষ্ঠা ও কার্যক্রম: ২৪ অক্টোবর ২০১৪ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, ২৫ ডিসেম্বর ২০১৫ আইনি কাঠামো কার্যকর হয় এবং ১৬ জানুয়ারি ২০১৬ আনুষ্ঠানিকভাবে বেইজিংয়ে কার্যক্রম শুরু হয়।
- সদর দফতর: বেইজিং, চীন।
- অনুমোদিত সদস্য: ১০৯টি দেশ (প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ৫৭টি; বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠাতা সদস্য)।
- শীর্ষ নেতৃত্ব: প্রেসিডেন্ট — জিন লিকুন (Jin Liqun), চীন।
- অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ: চীনের ভোটিং শেয়ার ২৬.০৬%। যেহেতু ব্যাংকের বড় নীতিগত সিদ্ধান্তে ৭৫% সুপার-মেজরিটি প্রয়োজন, ফলে চীন এককভাবে এআইআইবি-তে কার্যকর একক ভেটো ক্ষমতার অধিকারী।
৩. নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (NDB - New Development Bank / ব্রিকস ব্যাংক) #
- প্রতিষ্ঠা: ১৫ জুলাই ২০১৪ ব্রাজিলের ফোর্তালেজায় অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে ১০০ বিলিয়ন ডলারের মূলধন নিয়ে 'ফোর্তালেজা ঘোষণা'-র মাধ্যমে স্বাক্ষরিত হয়; কার্যকর হয় জুলাই ২০১৫ সালে।
- সদর দফতর: সাংহাই, চীন।
- সদস্যপদ: মূল ৫টি প্রতিষ্ঠাতা দেশ (ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা) ছাড়াও নতুন সদস্য: বাংলাদেশ (২০২১ সালে প্রথম নতুন সদস্য হিসেবে অনুমোদিত), সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিশর ও আলজেরিয়া।
- শীর্ষ নেতৃত্ব: প্রেসিডেন্ট — দিলমা রুসেফ (Dilma Rousseff), ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট। এর পরিচালনা নীতিতে সদস্য দেশগুলোর ভোটিং ক্ষমতা সমান (প্রতিষ্ঠাতা ৫ দেশের প্রত্যেকের সমপরিমাণ ২০% ভোট)।
📊 প্রধান তিনটি আঞ্চলিক ব্যাংকের তুলনামূলক মাস্টার ছক #
| সূচক ও বৈশিষ্ট্য | এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB) | এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক (AIIB) | নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (NDB / ব্রিকস ব্যাংক) |
|---|---|---|---|
| প্রতিষ্ঠার সন ও তারিখ | ১৯ ডিসেম্বর ১৯৬৬ | ২৫ ডিসেম্বর ২০১৫ (কার্যক্রম ১৬ জানুয়ারি ২০১৬) | ১৫ জুলাই ২০১৪ (ফোর্তালেজা ঘোষণা), কার্যকর ২০১৫ |
| সদর দফতর | ম্যানিলা, ফিলিপাইন | বেইজিং, চীন | সাংহাই, চীন |
| মোট সদস্য দেশ | ৬৮টি (আঞ্চলিক ৪৯, অনারঞ্চলিক ১৯) | ১০৯টি অনুমোদিত সদস্য | ৯টি (ব্রিকস ৫টি + বাংলাদেশ, ইউএই, মিশর, আলজেরিয়া) |
| শীর্ষ অর্থায়নকারী দেশ | জাপান ($১৫.৫৭%$) ও যুক্তরাষ্ট্র ($১৫.৫৭%$) | চীন ($২৬.০৬%$ ভোট, একক কার্যকর ভেটো) | ব্রিকসের মূল ৫ দেশের প্রত্যেকের সমপরিমাণ $২০%$ শেয়ার |
| শীর্ষ নেতৃত্বের পদবি | প্রেসিডেন্ট (প্রথাগতভাবে সর্বদা জাপানি নাগরিক) | প্রেসিডেন্ট (চীন কর্তৃক মনোনীত) | প্রেসিডেন্ট (সদস্য দেশগুলোর মধ্যে আবর্তিত হয়) |
| বর্তমান প্রেসিডেন্ট | মাসাতসুগু আসাকাওয়া (জাপান) | জিন লিকুন (চীন) | দিলমা রুসেফ (ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট) |
| অনুমোদিত মূলধন | প্রায় $১৪০\text{ বিলিয়ন ডলার}$ | $১০০\text{ বিলিয়ন ডলার}$ | $১০০\text{ বিলিয়ন ডলার}$ |
| ফ্ল্যাগশিপ প্রতিবেদন | Asian Development Outlook (ADO) | Asian Infrastructure Finance Report | NDB Annual Report |
| বাংলাদেশ প্রসঙ্গ | ১৯৭৩ সালে সদস্যপদ লাভ করে; যমুনা সেতু, পদ্মা রেল সংযোগসহ মেগা প্রকল্পে অন্যতম শীর্ষ ঋণদাতা। | বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের অন্যতম; বিদ্যুৎ গ্রিড ও যোগাযোগ খাতে বড় ঋণ সহায়তা পেয়েছে। | ব্রিকস বহির্ভূত দেশ হিসেবে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশ প্রথম নতুন সদস্য হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে এনডিবিতে যোগ দেয়। |
📊 টপিক ০৭: অর্থনৈতিক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান — মাস্টার সিন্থেসিস ও তুলনা সারণি #
| সংস্থা / প্রতিষ্ঠান / চুক্তি | সদর দফতর ও প্রতিষ্ঠাকাল | সদস্য সংখ্যা ও শীর্ষ পদাধিকারী | ঋণের ধরন / কার্যপরিধি / মূল নীতি | বিসিএস ও চাকরির পরীক্ষার হটস্পট তথ্য |
|---|---|---|---|---|
| IMF | ওয়াশিংটন ডিসি, যুক্তরাষ্ট্র (২৭ ডিসেম্বর ১৯৪৫) |
সদস্য: ১৯০টি এমডি: ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা |
স্বল্প ও মধ্যম মেয়াদি ঋণ; লেনদেনের ভারসাম্য সংকট দূরীকরণ; এসডিআর কোটা ব্যবস্থা। | এসডিআর বাস্কেটে ৫টি মুদ্রা; ১৬.৫% ভোটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একক ভেটো; সর্বশেষ সদস্য অ্যান্ডোরা (২০২০)। |
| IBRD | ওয়াশিংটন ডিসি, যুক্তরাষ্ট্র (১৯৪৪ / ১৯৪৬) |
সদস্য: ১৯০টি প্রেসিডেন্ট: অজয় বাঙ্গা |
মধ্যম আয়ের উন্নয়নশীল দেশগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক সংস্কার ঋণ। | বিশ্বব্যাংকের মূল স্তম্ভ; মার্কিন নাগরিক সর্বদা এর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। |
| IDA | ওয়াশিংটন ডিসি, যুক্তরাষ্ট্র (২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৬০) |
সদস্য: ১৭৪টি পরিচালিত হয় বিশ্বব্যাংক দ্বারা |
দরিদ্র দেশে সুদমুক্ত দীর্ঘমেয়াদি ঋণ (৩০-৩৮ বছর) ও অনুদান (সার্ভিস চার্জ ০.৭৫%)। | একে বিশ্বব্যাংকের 'Soft Loan Window' বলা হয়; বাংলাদেশ ১৯৭২ সালে এর সদস্য হয়। |
| IFC | ওয়াশিংটন ডিসি, যুক্তরাষ্ট্র (২০ জুলাই ১৯৫৬) |
সদস্য: ১৮৬টি পরিচালিত হয় বিশ্বব্যাংক দ্বারা |
উন্নয়নশীল দেশের বেসরকারি শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানকে সরকারি গ্যারান্টি ছাড়া অর্থায়ন। | সরাসরি বেসরকারি খাতে বিনিয়োগকারী সংস্থা; কোনো সরকারি জামানতের বাধ্যবাধকতা নেই। |
| MIGA | ওয়াশিংটন ডিসি, যুক্তরাষ্ট্র (১২ এপ্রিল ১৯৮৮) |
সদস্য: ১৮২টি পরিচালিত হয় বিশ্বব্যাংক দ্বারা |
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের রাজনৈতিক ঝুঁকি (অধিগ্রহণ, যুদ্ধ, সামাজিক অস্থিরতা) থেকে সুরক্ষা ও বীমা। | অ-বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক ঝুঁকি নিরসনে বীমা ও গ্যারান্টি প্রদান করে থাকে। |
| ICSID | ওয়াশিংটন ডিসি, যুক্তরাষ্ট্র (১৪ অক্টোবর ১৯৬৬) |
সদস্য: ১৬৫টি পরিচালিত হয় বিশ্বব্যাংক দ্বারা |
বিদেশি বিনিয়োগকারী ও সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যকার আইনি বিরোধ মধ্যস্থতা ও সালিশি। | আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ বিরোধ নিষ্পত্তির স্থায়ী কনসিলিয়েশন ও আরবিট্রেশন ফোরাম। |
| WTO | জেনেভা, সুইজারল্যান্ড (১ জানুয়ারি ১৯৯৫) |
সদস্য: ১৬৬টি ডিজি: এনগোজি ওকোনজো-ইওয়ালা |
বহুপাক্ষিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়ন; শুল্ক হ্রাস; বিরোধ নিষ্পত্তি (DSB)। | মারাক্কেশ চুক্তির মাধ্যমে GATT থেকে রূপান্তর; MFN ও TRIPS নীতি; সর্বশেষ সদস্য কমোরোস ও তিমুর-লেস্তে (২০২৪)। |
| ADB | ম্যানিলা, ফিলিপাইন (১৯ ডিসেম্বর ১৯৬৬) |
সদস্য: ৬৮টি প্রেসিডেন্ট: মাসাতসুগু আসাকাওয়া |
এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন। | জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের সমান শেয়ার (১৫.৫৭%); প্রেসিডেন্ট সর্বদা জাপানি নাগরিক; সদর দফতর ম্যানিলা। |
| AIIB | বেইজিং, চীন (২৫ ডিসেম্বর ২০১৫) |
অনুমোদিত: ১০৯টি প্রেসিডেন্ট: জিন লিকুন |
জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও পরিবহন অবকাঠামো নির্মাণে সহজ শর্তে ও বাণিজ্যিক ঋণ। | চীনের ২৬.০৬% ভেটো ক্ষমতা; সদর দফতর বেইজিং; বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠাতা সদস্য রাষ্ট্র। |
| NDB | সাংহাই, চীন (১৫ জুলাই ২০১৪) |
সদস্য: ৯টি প্রেসিডেন্ট: দিলমা রুসেফ |
টেকসই অবকাঠামো ও ব্রিকস উন্নয়নশীল দেশসমূহের অর্থনৈতিক উন্নয়ন। | 'ব্রিকস ব্যাংক' নামে পরিচিত; প্রতিটি প্রতিষ্ঠাতা দেশের সমপরিমাণ ২০% শেয়ার; ২০২১ সালে বাংলাদেশ প্রথম নতুন সদস্য। |
| ক্রম | ছন্দ / শর্টকাট মেমোরি সূত্র | নিমনিক ডিকোডার ও মূল তথ্যসূত্র | লক্ষ্যভিত্তিক পরীক্ষার প্রশ্ন |
|---|---|---|---|
| ১ | ‘৪৪-এর মাউন্টে ৪৪ দেশ, কেইনস-হোয়াইটের যমজ জন্ম ওয়াশিংটনে শেষ’ | ১৯৪৪ সালে নিউ হ্যাম্পশায়ারের মাউন্ট ওয়াশিংটন হোটেলে ৪৪টি দেশের উপস্থিতিতে ব্রেটন উডস যমজ (IMF ও IBRD) প্রতিষ্ঠিত হয়; উভয়ের সদর দফতর ওয়াশিংটন ডিসি। | ব্রেটন উডস সম্মেলন কোথায় ও কত সালে অনুষ্ঠিত হয়? ব্রেটন উডস যমজ কারা? |
| ২ | ‘আইএমএফ করে ব্যালেন্স ঠিক, এসডিআরে পাঁচ মুদ্রা ক্লিপ’ | IMF-এর মূল কাজ সদস্য দেশের লেনদেনের ভারসাম্য (Balance of Payments) ঠিক রাখা। এসডিআরে ৫টি মুদ্রা: ডলার, ইউরো, রেনমিনবি (ইউয়ান), ইয়েন, পাউন্ড। | IMF-এর ঋণ দেওয়ার প্রধান ক্ষেত্র কোনটি? এসডিআর বাস্কেটে মুদ্রা কয়টি? |
| ৩ | ‘আইবিআরডি গড়ে দেশ, আইডিএ দেয় সুদমুক্ত ক্যাশ’ | IBRD অবকাঠামো পুনর্গঠন ঋণ দেয়, আর IDA বিশ্বের দরিদ্রতম দেশকে সুদমুক্ত দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেয় বলে একে 'Soft Loan Window' বলে। | বিশ্বব্যাংকের 'সফট লোন উইন্ডো' বলা হয় কোনটিকে? |
| ৪ | ‘আইএফসি প্রাইভেটে লড়ে, মিগা দেয় ঝুঁকি কাটিয়ে’ | IFC বেসরকারি খাতে সরকারি গ্যারান্টি ছাড়া সরাসরি বিনিয়োগ করে; আর MIGA রাজনৈতিক ও অ-বাণিজ্যিক ঝুঁকির বিরুদ্ধে বীমা দেয়। | সরকারি গ্যারান্টি ছাড়া ঋণ দেয় কোনটি? রাজনৈতিক ঝুঁকি বীমা দেয় কোনটি? |
| ৫ | ‘৪৭-এ গ্যাট, ৮৬-তে উরুগুয়ে, ৯৪-এর মারাক্কেশে ৯৫-এ ডব্লিউটিও জেনেভায় দাঁড়িয়ে’ | ১৯৪৭-এ GATT চুক্তি, ১৯৮৬-তে উরুগুয়ে রাউন্ড, ১৯৯৪-এর ১৫ এপ্রিল মারাক্কেশ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং ১৯৯৫ সালের ১ জানুয়ারি জেনেভায় WTO গঠিত হয়। | WTO কোন সালে, কোন চুক্তির মাধ্যমে এবং কোন শহরে প্রতিষ্ঠিত হয়? |
| ৬ | ‘এডিবি ম্যানিলায় জাপানি টানে, এআইআইবি বেইজিংয়ে চীন ভেটো হানে, এনডিবি সাংহাইতে ব্রিকস দেশ বনে’ | এডিবির সদর দফতর ম্যানিলা (জাপানি প্রেসিডেন্ট); এআইআইবির সদর দফতর বেইজিং (চীনের ২৬.০৬% ভেটো ক্ষমতা); এনডিবির সদর দফতর সাংহাই (ব্রিকস ব্যাংক, বাংলাদেশ সদস্য ২০২১)। | ADB, AIIB ও NDB-এর সদর দফতর কোথায়? কোন ব্যাংকে চীনের একক ভেটো আছে? |