টপিক 09 / ৩০আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংস্থাসমূহ এবং জ্বালানি রাজনীতি📖 স্টাডি নোট

টপিক 09: ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইউরোপীয় সংস্থাসমূহ

টপিক ০৯: ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইউরোপীয় সংস্থাসমূহ (European Union & European Organizations) #

🌐 অধ্যায় পরিচিতি ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট (Chapter Prologue: বিষয়টি কী ও কেন) #

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ইতিহাসে ইউরোপীয় সমাকলন (European Integration) হলো সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার এক অভূতপূর্ব ও বৈপ্লবিক পরীক্ষা। শতাব্দীপ্রাচীন যুদ্ধবিগ্রহ, সাম্রাজ্যবাদী সংঘাত এবং বিশেষ করে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সর্বনাশা রক্তক্ষয়ের পর ইউরোপের রাষ্ট্রনায়করা উপলব্ধি করেন যে, কেবল জাতীয়তাবাদী প্রতিদ্বন্দ্বিতা দিয়ে স্থায়ী শান্তি অর্জন অসম্ভব। সার্বভৌমত্বের কিছু অংশ বহুপাক্ষিক কাঠামোর কাছে সমর্পণ করে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংহতি গড়ে তোলার মাধ্যমেই কেবল সংঘাতমুক্ত সমৃদ্ধ ইউরোপ নির্মাণ সম্ভব।

শুমান পরিকল্পনা থেকে পরা-রাষ্ট্রিক ইউরোপের জন্ম #

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল ফ্রান্স ও জার্মানির মধ্যকার কয়লা ও ইস্পাতসমৃদ্ধ সীমান্তবর্তী রুহর ও আলসাস-লোরেন অঞ্চলের ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব। এই চিরন্তন শত্রুতার স্থায়ী অবসানে ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট শুমান (Robert Schuman) ১৯৫০ সালের ৯ মে এক ঐতিহাসিক ঘোষণা প্রদান করেন, যা ‘শুমান পরিকল্পনা’ (Schuman Declaration) নামে খ্যাত। এই পরিকল্পনার মূল দর্শন ছিল—ফ্রান্স ও জার্মানির কয়লা ও ইস্পাত উৎপাদনকে একটি একক যৌথ কর্তৃপক্ষের অধীনে এনে যুদ্ধকে কেবল ‘অভাবনীয় নয়, বরং বস্তুগতভাবে অসম্ভব’ (Materially Impossible) করে তোলা।

এই ক্ষুদ্র অর্থনৈতিক পদক্ষেপ থেকেই পর্যায়ক্রমে জন্ম নেয় ইউরোপীয় কয়লা ও ইস্পাত সম্প্রদায় (ECSC, ১৯৫১), ইউরোপীয় অর্থনৈতিক সম্প্রদায় (EEC, ১৯৫৭) এবং অবশেষে ১৯৯৩ সালের মাস্ট্রিখট চুক্তির মাধ্যমে আজকের ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU)—যা বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে সফল একক বাজার, একক মুদ্রা অঞ্চল এবং সুপার-ন্যাশনালিজম (Supranationalism)-এর বিশ্বস্ত মডেল।

🗺️ অধ্যায় স্থাপত্য মানচিত্র (Chapter Architecture Map) ইউরোপীয় সমাকলন ও প্রাতিষ্ঠানিক কূটনীতি ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) রূপরেখা • ECSC (১৯৫১) ➔ EEC (১৯৫৭) • মাস্ট্রিখট চুক্তি (১৯৯৩): জন্ম • লিসবন চুক্তি (২০০৯): সংস্কার • সদস্য: ২৭ দেশ (সদর: ব্রাসেলস) • ৭টি অঙ্গ (কমিশন, পার্লামেন্ট) ইউরোজোন ও শেনজেন এলাকা • ইউরোজোন: ২০ দেশ (ক্রোয়েশিয়া ২০তম দেশ, ২০২৩) • একক মুদ্রা: ইউরো (২০০২ নগদ) • শেনজেন: ২৯ দেশ (সীমান্তহীন) (বুলগেরিয়া, রোমানিয়া ২০২৪) ব্রেক্সিট ও ইউরোপীয় সংস্থা • ব্রেক্সিট: যুক্তরাজ্য প্রস্থান (৩১ জানুয়ারি ২০২০) • অনুচ্ছেদ ৫০ (লিসবন চুক্তি) • কাউন্সিল অব ইউরোপ (CoE: ৪৬) • OSCE (ভিয়েনা, ৫৭ সদস্য) 📊 মাস্টার সিন্থেসিস ও তাত্ত্বিক কাঠামো রূপরেখা

৯.১ ইউরোপীয় ইউনিয়নের ঐতিহাসিক বিকাশ: শুমান পরিকল্পনা থেকে লিসবন চুক্তি #

🏛️ প্রাতিষ্ঠানিক ডাটা কার্ড: ইউরোপীয় ইউনিয়ন (European Union - EU)
• প্রতিষ্ঠার ভিত্তি ও তারিখ: মাস্ট্রিখট চুক্তি অনুযায়ী ১ নভেম্বর ১৯৯৩।
• সদর দফতর: ব্রাসেলস, বেলজিয়াম (কার্যনির্বাহী রাজধানী)। অন্যান্য প্রধান অফিস: স্ট্রাসবার্গ (পার্লামেন্ট) ও লুক্সেমবার্গ (বিচার আদালত)।
• বর্তমান সদস্য রাষ্ট্র: ২৭টি দেশ (পূর্বে ২৮টি ছিল; ৩১ জানুয়ারি ২০২০ যুক্তরাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্থান করায় সদস্য সংখ্যা কমে ২৭-এ দাঁড়ায়)।
• শীর্ষ নেতৃত্ব: ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট — উরসুলা ভন ডার লিয়েন (Ursula von der Leyen), জার্মানি; ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট — আন্তোনিও কস্তা (António Costa), পর্তুগাল (পূর্বে চার্লস মিশেল); ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রেসিডেন্ট — রবার্তা মেতসোলা (Roberta Metsola), মাল্টা।
• ঐতিহাসিক নোবেল স্বীকৃতি: ইউরোপে শান্তি, পুনর্মিলন ও গণতন্ত্র প্রসারে অবদান রাখায় ২০১২ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করে।
• ইউরোপ দিবস: প্রতি বছর ৯ মে শুমান পরিকল্পনার স্মরণে 'ইউরোপ দিবস' (Europe Day) পালিত হয়।
টপিক 09: কাঠামোগত রূপরেখা ও বিষয়ভিত্তিক মানচিত্র 📊 ঐতিহাসিক টাইমলাইন ইউরোপীয় সংহতির মাইলফলক শুমান পরিকল্পনা ► প্যারিস চুক্তি ► রোম চুক্তি ► মাস্ট্রিখট চুক্তি ► লিসবন চুক্তি (৯ মে ১৯৫০; (ECSC কয়লা ও (EEC অর্থনৈতিক (EU এর আনুষ্ঠানিক (সাংবিধানিক সংস্কার, ইউরোপ দিবসের জন্ম) ইস্পাত সম্প্রদায়; সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠা; জন্ম, ৩টি স্তম্ভ ও অনুচ্ছেদ ৫০ সংযোজন; প্রতিষ্ঠাতা ৬ দেশ) কার্যকর ১৯৫৮) একক ইউরোর রোডম্যাপ) কার্যকর ১ ডিসে ২০০৯)

ঐতিহাসিক চুক্তিসমূহের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ #

১. শুমান পরিকল্পনা (Schuman Declaration - ৯ মে ১৯৫০): ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী রবার্ট শুমান কর্তৃক ঘোষিত এই ঐতিহাসিক রূপরেখাকে ইউরোপীয় ঐক্যের ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে গণ্য করা হয়।
২. প্যারিস চুক্তি (Treaty of Paris - ১৮ এপ্রিল ১৯৫১): শুমান পরিকল্পনার আলোকে ৬টি দেশ—ফ্রান্স, পশ্চিম জার্মানি, ইতালি, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস ও লুক্সেমবার্গ (যাদেরকে বলা হয় 'ইনার সিক্স' / Inner Six)—স্বাক্ষর করে European Coal and Steel Community (ECSC) প্রতিষ্ঠা করে।
৩. রোম চুক্তি (Treaty of Rome - ২৫ মার্চ ১৯৫৭): এই ঐতিহাসিক চুক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় European Economic Community (EEC) বা সাধারণ বাজার (Common Market) এবং European Atomic Energy Community (Euratom)। এটি ১ জানুয়ারি ১৯৫৮ কার্যকর হয়।
৪. মার্জার চুক্তি (Merger Treaty / ব্রাসেলস চুক্তি - ১৯৬৫): ECSC, EEC এবং Euratom-কে একত্রিত করে ১৯৬৭ সালের ১ জুলাই 'ইউরোপীয় সম্প্রদায়' (European Communities - EC) গঠন করা হয়।
৫. শেনজেন চুক্তি (Schengen Agreement - ১৪ জুন ১৯৮৫): লুক্সেমবার্গের শেনজেন শহরে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ তুলে নেওয়ার ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
৬. মাস্ট্রিখট চুক্তি (Maastricht Treaty - ৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৯২): নেদারল্যান্ডসের মাস্ট্রিখটে স্বাক্ষরিত হয় আনুষ্ঠানিক Treaty on European Union (TEU)। ১ নভেম্বর ১৯৯৩ এই চুক্তি কার্যকরের মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) আত্মপ্রকাশ করে। এর আওতায় একক মুদ্রা ইউরো চালু এবং ইউরোপীয় নাগরিকত্ব প্রবর্তন করা হয়।
৭. লিসবন চুক্তি (Treaty of Lisbon - ১৩ ডিসেম্বর ২০০৭): পূর্বে প্রস্তাবিত 'ইউরোপীয় সংবিধান' ব্যর্থ হওয়ার পর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের জন্য লিসবন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং ১ ডিসেম্বর ২০০৯ কার্যকর হয়। এই চুক্তির মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়নের স্থায়ী প্রেসিডেন্টের পদ সৃষ্টি করা হয় এবং কোনো সদস্য দেশের প্রস্থান সংক্রান্ত ঐতিহাসিক 'অনুচ্ছেদ ৫০' (Article 50) সংযুক্ত করা হয়।


৯.২ ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও ৭টি প্রধান অঙ্গ #

লিসবন চুক্তি অনুযায়ী ইউরোপীয় ইউনিয়ন একটি সুসংজ্ঞায়িত পরা-রাষ্ট্রিক কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হয়, যার ৭টি প্রধান সাংবিধানিক অঙ্গ রয়েছে:

ইউরোপীয় ইউনিয়নের ৭টি প্রধান সাংবিধানিক অঙ্গ ১. ইউরোপীয় কমিশন (কার্যনির্বাহী) 📍 ব্রাসেলস • প্রেসিডেন্ট: ভন ডার লিয়েন • আইন প্রণয়নের একক উদ্যোগ ২. ইউরোপীয় কাউন্সিল 📍 ব্রাসেলস • শীর্ষ নেতা দের সম্মেল • দিক নির্দে নির্ধারণ ৩. ইউরোপীয় পার্লাম 📍স্ট্রাসব • ৭২০ নির্ সদস্য আস • আইন পাসে সহ কর্তৃত ৪. কাউন্সিল ট অব দ্ গ EU িত 📍 ব্র • সংশ্লি জাতীয় মন্ত্র ৫. বিচার আদালত (CJEU) 📍 লুক্সেমবার লস • ইইউ আইনের ব্যাখ্যা ও 📊 মাস্টার সিন্থেসিস ও তাত্ত্বিক কাঠামো রূপরেখা

প্রধান অঙ্গসমূহের তুলনামূলক বিশ্লেষণ ও দায়িত্ব #

  1. ইউরোপীয় কমিশন (European Commission): ব্রাসেলসে অবস্থিত। এটি ইইউ-এর প্রধান কার্যনির্বাহী শাখা (Executive Body) বা 'ডি ফ্যাক্টো সরকার'। প্রতিটি সদস্য দেশ থেকে একজন করে মোট ২৭ জন কমিশনার নিয়ে গঠিত। ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইন প্রণয়নের একক প্রস্তাবনা প্রদানের অধিকার (Right of Initiative) কেবল কমিশনের রয়েছে। বর্তমান প্রেসিডেন্ট: উরসুলা ভন ডার লিয়েন।
  2. ইউরোপীয় কাউন্সিল (European Council): ব্রাসেলসে অনুষ্ঠিত। ২৭টি সদস্য দেশের সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধান এবং কমিশন প্রেসিডেন্টের শীর্ষ সম্মেলন। এটি ইইউ-এর সামগ্রিক রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা ও অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে। এর কোনো আইন প্রণয়ন ক্ষমতা নেই।
  3. ইউরোপীয় পার্লামেন্ট (European Parliament): মূল আইনসভা। স্ট্রাসবার্গে মূল পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন বসে এবং ব্রাসেলসে কমিটির কাজ চলে। এটি বিশ্বের একমাত্র সরাসরি আন্তর্জাতিক সংসদ, যার সদস্যরা (MEP) সদস্য দেশগুলোর নাগরিকদের সরাসরি ভোটে প্রতি ৫ বছর অন্তর নির্বাচিত হন। মোট আসন সংখ্যা ৭২০টি। বর্তমান প্রেসিডেন্ট: রবার্তা মেতসোলা।
  4. কাউন্সিল অব দ্য ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (Council of the EU / Council of Ministers): ব্রাসেলসে বসে। সদস্য দেশগুলোর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীরা (যেমন: পররাষ্ট্রমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী) নির্দিষ্ট বিষয়ে বৈঠকে বসেন এবং পার্লামেন্টের সাথে যৌথভাবে আইন ও বাজেট অনুমোদন করেন।
  5. ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিচার আদালত (Court of Justice of the European Union - CJEU): সদর দফতর লুক্সেমবার্গ। সদস্য রাষ্ট্রসমূহ এবং ইইউ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইনের সঠিক প্রয়োগ ও ব্যাখ্যা প্রদানকারী সর্বোচ্চ আদালত।
  6. ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংক (European Central Bank - ECB): সদর দফতর ফ্রাঙ্কফুর্ট, জার্মানি। ইউরোজোনের মুদ্রানীতি পরিচালনা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং একক মুদ্রা 'ইউরো'-র সরবরাহ তদারকি করে। বর্তমান প্রেসিডেন্ট: ক্রিস্টিন লাগার্দে (Christine Lagarde), ফ্রান্স (আইএমএফের সাবেক এমডি)।
  7. ইউরোপীয় অডিট আদালত (European Court of Auditors): লুক্সেমবার্গে অবস্থিত। ইইউ-এর রাজস্ব সংগ্রহ ও বাজেট ব্যয়ের আর্থিক স্বচ্ছতা নিরীক্ষা করে।

৯.৩ ইউরোজোন ও শেনজেন চুক্তি (Eurozone & Schengen Area) #

ইউরোপীয় ইউনিয়নের গভীর সমাকলনের দুটি প্রধান স্তম্ভ হলো অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে একক মুদ্রা 'ইউরোজোন' এবং মুক্ত চলাচলের ক্ষেত্রে 'শেনজেন অঞ্চল'। তবে মনে রাখা জরুরি, ইইউ-এর সকল সদস্য ইউরোজোন বা শেনজেনের সদস্য নয়, আবার ইইউ বহির্ভূত কিছু দেশও শেনজেনের অন্তর্ভুক্ত।

ইউরোপীয় সংহতির সমকেন্দ্রিক বৃত্ত কাঠামো ইউরোজোন (Eurozone ২০ দেশ) • ইইউ সদস্য রাষ্ট্র: ২০টি দেশ • মুদ্রা: ইউরো (€) • সূচনা: ১৯৯৯ (বুকিং), ২০০২ (নগদ) • সর্বশেষ ২০তম সদস্য: ক্রোয়েশিয়া (১ জানুয়ারি ২০২৩) শেনজেন অঞ্চল (Schengen ২৯) • ইইউ সদস্য: ২৫টি দেশ নন ইইউ ৪ দেশ: নরওয়ে, আইসল্যান্ড সুইজারল্যান্ড, লিচেনস্টাইন • ২০২৪ হালনাগাদ: রোমানিয়া ও বুলগেরিয়া আকাশ/নৌপথে যুক্ত 📊 মাস্টার সিন্থেসিস ও তাত্ত্বিক কাঠামো রূপরেখা

১. ইউরোজোন (Eurozone) ও একক মুদ্রা ইউরো #

  • সূচনা: ১৯৯২ সালের মাস্ট্রিখট চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ১৯৯৯ সালের ১ জানুয়ারি আর্থিক লেনদেন ও ব্যাংকিংয়ের জন্য ইউরো চালু হয়। ২০০২ সালের ১ জানুয়ারি ১২টি দেশে প্রথম কাগজের নোট ও ধাতব মুদ্রা হিসেবে সাধারণ মানুষের লেনদেনে ইউরো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচলিত হয়।
  • বর্তমান সদস্য: ২০টি দেশ।
  • সর্বশেষ সদস্য: ক্রোয়েশিয়া ১ জানুয়ারি ২০২৩ তারিখে তাদের পূর্বতন মুদ্রা 'কুনা' (Kuna) বাতিল করে ইউরোজোনের ২০তম সদস্য হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ইউরো গ্রহণ করে।
  • ব্যতিক্রম: ডেনমার্ক চুক্তিভিত্তিক অপ্ট-আউট (Opt-out) অধিকারের মাধ্যমে নিজস্ব মুদ্রা 'ক্রোন' (Krone) বজায় রেখেছে। পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, চেক প্রজাতন্ত্র ও সুইডেন নিজস্ব মুদ্রা ব্যবহার করে থাকে।

২. শেনজেন চুক্তি ও অঞ্চল (Schengen Area) #

  • পটভূমি: ১৯৮৫ সালের ১৪ জুন লুক্সেমবার্গ, জার্মানি ও ফ্রান্সের সীমান্তবর্তী ছোট শহর শেনজেনে ৫টি দেশ অভ্যন্তরীণ সীমান্ত তুলে নিতে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে।
  • কার্যকারিতা: ১৯৯৫ সালের ২৬ মার্চ শেনজেন অঞ্চলের বিধান কার্যকর হয়, যার মাধ্যমে সদস্য দেশগুলোর মধ্যকার সীমানা চৌকি, পাসপোর্ট ও ভিসা তল্লাশি স্থায়ীভাবে বিলুপ্ত হয়।
  • বর্তমান সদস্য: ২৯টি দেশ।
    • ইইউ-এর অন্তর্ভুক্ত ২৫টি দেশ (আয়ারল্যান্ড ও সাইপ্রাস ব্যতীত)।
    • ইইউ-বহির্ভূত ৪টি নন-ইইউ দেশ: সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে, আইসল্যান্ড এবং লিচেনস্টাইন।
  • ২০২৪ সালের যুগান্তকারী পরিবর্তন: ৩১ মার্চ ২০২৪ ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্র রোমানিয়া ও বুলগেরিয়া শেনজেন জোনের আংশিক সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয় (তাদের আকাশ ও নৌ সীমানায় পাসপোর্ট তল্লাশি প্রত্যাহার করা হয়)।

৯.৪ ব্রেক্সিট (Brexit): যুক্তরাজ্যের প্রস্থান ও অনুচ্ছেদ ৫০ #

‘ব্রেক্সিট’ (Brexit) শব্দটি British Exit-এর সংক্ষিপ্ত রূপ, যা ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে যুক্তরাজ্যের নিয়মতান্ত্রিক প্রস্থানকে নির্দেশ করে।

টপিক 09: কাঠামোগত রূপরেখা ও বিষয়ভিত্তিক মানচিত্র 📊 ঐতিহাসিক টাইমলাইন ব্রেক্সিট পরিক্রমা যুক্তরাজ্যের ঐতিহাসিক গণভোট অনুচ্ছেদ ৫০ সক্রিয় বরিস জনসনের আনুষ্ঠানিক ব্রেক্সিট EEC তে যোগদান (২৩ জুন ২০১৬; (২৯ মার্চ ২০১৭; নির্বাচন বিজয় ও (৩১ জানুয়ারি ২০২০; ৫১.৮৯% ব্রেক্সিট প্রধানমন্ত্রী উইথড্রয়াল চুক্তি যুক্তরাজ্য ইইউ ত্যাগ সমর্থনে ভোট) থেরেসা মে কর্তৃক) অনুমোদন) করে, সদস্য কমে ২৭)

১. ঐতিহাসিক গণভোট (২৩ জুন ২০১৬) #

যুক্তরাজ্য ১৯৭৩ সালে ইউরোপীয় অর্থনৈতিক সম্প্রদায় (EEC)-তে যোগদান করেছিল। কিন্তু ইইউ অভিবাসন নীতি, বাজেট চাঁদা এবং জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার দাবিতে কনজারভেটিভ পার্টির মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়। প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন গণভোটের প্রতিশ্রুতি দেন।

  • গণভোটের ফলাফল: ২৩ জুন ২০১৬ অনুষ্ঠিত গণভোটে যুক্তরাজ্যের ৫১.৮৯% নাগরিক ইইউ ত্যাগের পক্ষে এবং ৪৮.১১% নাগরিক থাকার পক্ষে ভোট দেয়।
  • রাজনৈতিক প্রভাব: ফলাফলের পর ডেভিড ক্যামেরন পদত্যাগ করেন এবং থেরেসা মে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন।

২. অনুচ্ছেদ ৫০ ও যুক্তরাজ্যের প্রস্থান #

  • লিসবন চুক্তির অনুচ্ছেদ ৫০ (Article 50): এটি কোনো সদস্য রাষ্ট্রের স্বেচ্ছায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে প্রস্থান করার আনুষ্ঠানিক ও সাংবিধানিক আইনি প্রক্রিয়া।
  • সক্রিয়করণ: ২৯ মার্চ ২০১৭ তারিখে তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে অনুচ্ছেদ ৫০ কার্যকর করে প্রস্থান প্রক্রিয়া শুরু করেন।
  • চূড়ান্ত প্রস্থান: সুদীর্ঘ সাড়ে তিন বছরের জটিল কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক দরকষাকষির পর প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের নেতৃত্বে ২০২০ সালের ৩১ জানুয়ারি মধ্যরাতে (যুক্তরাজ্যের সময় রাত ১১টা) যুক্তরাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগ করে।
  • ফলাফল: ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য সংখ্যা ২৮ থেকে কমে ২৭টিতে দাঁড়ায়।

৯.৫ কাউন্সিল অব ইউরোপ ও ইউরোপীয় অন্যান্য সংস্থা #

শিক্ষার্থীরা প্রায়শই ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) এবং কাউন্সিল অব ইউরোপ (Council of Europe)-কে গুলিয়ে ফেলে। নিচে এদের সুনির্দিষ্ট পার্থক্য তুলে ধরা হলো:

১. কাউন্সিল অব ইউরোপ (Council of Europe - CoE) #

  • প্রতিষ্ঠা: ৫ মে ১৯৪৯ (লন্ডন চুক্তির মাধ্যমে)।
  • সদর দফতর: স্ট্রাসবার্গ, ফ্রান্স (Palais de l'Europe)।
  • বর্তমান সদস্য: ৪৬টি দেশ (পূর্বে ৪৭টি ছিল)।
  • মূল ম্যান্ডেট: ইউরোপে মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও আইনের শাসন সুসংহত করা। এটি কোনো অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক সংস্থা নয়।
  • প্রধান অঙ্গ: ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালত (European Court of Human Rights - ECHR) পরিচালনা করে এই সংস্থা।
  • রাশিয়ার বহিষ্কার: ইউক্রেনে পূর্ণাঙ্গ সামরিক আগ্রাসন চালানোর অপরাধে ১৬ মার্চ ২০২২ কাউন্সিল অব ইউরোপ রাশিয়াকে আনুষ্ঠানিকভাবে সংস্থা থেকে বহিষ্কার করে।

২. ইউরোপে নিরাপত্তা ও সহযোগিতা সংস্থা (OSCE) #

  • প্রতিষ্ঠা: ১৯৭৫ সালের ঐতিহাসিক হেলসিঙ্কি ফাইনাল অ্যাক্ট (Helsinki Accords)-এর ভিত্তিতে গঠিত CSCE পরবর্তীতে ১৯৯৫ সালে OSCE রূপ লাভ করে।
  • সদর দফতর: ভিয়েনা, অস্ট্রিয়া।
  • মোট সদস্য: ৫৭টি দেশ (ইউরোপের দেশসমূহ ছাড়াও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্য এশীয় প্রজাতন্ত্রসমূহ এর অন্তর্ভুক্ত)।
  • ম্যান্ডেট: অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ, মানবাধিকার সুরক্ষা, অবাধ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ এবং সংঘাত প্রতিরোধ।

📊 টপিক ০৯: ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইউরোপীয় সংস্থাসমূহ — মাস্টার সিন্থেসিস ও তুলনা সারণি #

সংস্থা / প্রতিষ্ঠান / প্রক্রিয়া সদর দফতর ও প্রতিষ্ঠাকাল সদস্য সংখ্যা ও শীর্ষ পদাধিকারী মূল উদ্দেশ্য ও ম্যান্ডেট বিসিএস ও চাকরির পরীক্ষার হটস্পট তথ্য
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) ব্রাসেলস, বেলজিয়াম
(১ নভেম্বর ১৯৯৩)
সদস্য: ২৭টি দেশ
প্রেসিডেন্ট: উরসুলা ভন ডার লিয়েন
একক বাজার, উন্মুক্ত সীমান্ত, অভিন্ন আইন ও পররাষ্ট্র নীতি। প্রতিষ্ঠাতা ৬ দেশ ('ইনার সিক্স'); মাস্ট্রিখট চুক্তি দ্বারা প্রতিষ্ঠিত; ২০১২ সালে শান্তিতে নোবেল।
ইউরোপীয় কমিশন ব্রাসেলস, বেলজিয়াম
(১৯৫৮)
সদস্য: ২৭ জন কমিশনার
প্রেসিডেন্ট: উরসুলা ভন ডার লিয়েন
ইইউ-এর প্রধান নির্বাহী অঙ্গ ও আইন প্রণয়নের একক প্রস্তাবক। এটি ইইউ-এর 'ডি ফ্যাক্টো কেবিনেট' হিসেবে দৈনন্দিন নীতি পরিচালনা করে।
ইউরোপীয় পার্লামেন্ট স্ট্রাসবার্গ, ফ্রান্স
(১৯৫২/১৯৭৯)
সদস্য: ৭২০ জন MEP
প্রেসিডেন্ট: রবার্তা মেতসোলা
যৌথ আইন প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদন ও কমিশনের তদারকি। বিশ্বের একমাত্র আন্তর্জাতিক সংসদ যেখানে নাগরিকরা সরাসরি ভোটে প্রতিনিধি নির্বাচন করেন।
ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংক (ECB) ফ্রাঙ্কফুর্ট, জার্মানি
(১ জুন ১৯৯৮)
ইউরোজোন সদস্য: ২০টি দেশ
প্রেসিডেন্ট: ক্রিস্টিন লাগার্দে
ইউরো মুদ্রার তারল্য ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং একক মুদ্রানীতি। সদর দফতর ফ্রাঙ্কফুর্ট; ২০তম সদস্য ক্রোয়েশিয়া (২০২৩)।
শেনজেন অঞ্চল লুক্সেমবার্গ
(চুক্তি ১৯৮৫, কার্যকর ১৯৯৫)
সদস্য: ২৯টি দেশ
(২৫টি ইইউ + ৪টি নন-ইইউ)
অভ্যন্তরীণ সীমানা চৌকি ও পাসপোর্ট নিয়ন্ত্রণহীন উন্মুক্ত চলাচল। নন-ইইউ ৪ দেশ: সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে, আইসল্যান্ড, লিচেনস্টাইন; রোমানিয়া ও বুলগেরিয়া যুক্ত ২০২৪।
কাউন্সিল অব ইউরোপ (CoE) স্ট্রাসবার্গ, ফ্রান্স
(৫ মে ১৯৪৯)
সদস্য: ৪৬টি দেশ
সেক্রেটারি জেনারেল: অ্যালেন বারসেট
মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও আইনের শাসন সুসংহতকরণ (ECHR আদালত)। ইইউ-এর সাথে সম্পর্কহীন স্বাধীন সংস্থা; ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ২০২২ সালে রাশিয়াকে বহিষ্কার করা হয়।
OSCE ভিয়েনা, অস্ট্রিয়া
(১৯৭৫ / ১৯৯৫)
সদস্য: ৫৭টি দেশ
সেক্রেটারি জেনারেল
নির্বাচন পর্যবেক্ষণ, সামরিক আস্থা বৃদ্ধি ও নিরাপত্তা সংলাপ। হেলসিঙ্কি চুক্তির মাধ্যমে সূচিত; যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া উভয়ই এর সদস্য।

ক্রম ছন্দ / শর্টকাট মেমোরি সূত্র নিমনিক ডিকোডার ও মূল তথ্যসূত্র লক্ষ্যভিত্তিক পরীক্ষার প্রশ্ন
১ ‘৫০-এ শুমান ডাকে, ৫১-এর প্যারিসে কয়লা থাকে, ৫৭-এর রোমে বাজার পাকা, ৯২-এর মাস্ট্রিখটে ইইউ আঁকা’ ১৯৫০ সালে শুমান পরিকল্পনা, ১৯৫১ সালে প্যারিস চুক্তিতে কয়লা ও ইস্পাত সম্প্রদায়, ১৯৫৭ রোমে EEC এবং ১৯৯২ মাস্ট্রিখটে EU প্রতিষ্ঠিত হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন গঠনের ঐতিহাসিক পর্যায়ক্রম কী? মাস্ট্রিখট চুক্তি কবে স্বাক্ষরিত হয়?
২ ‘কমিশন ব্রাসেলসে বসে, পার্লামেন্ট স্ট্রাসবার্গে এসে, কোর্ট লুক্সেমবার্গে ন্যায়ের উদ্দেশ্যে, ব্যাংক ফ্রাঙ্কফুর্টে ইউরোর আবেশে’ কমিশনের সদর দফতর ব্রাসেলস, পার্লামেন্ট স্ট্রাসবার্গে, বিচার আদালত লুক্সেমবার্গে এবং ইউরোপীয় সেন্ট্রাল ব্যাংক ফ্রাঙ্কফুর্টে। ইইউ কমিশনের সদর দফতর কোথায়? ইউরোপিয়ান সেন্ট্রাল ব্যাংক (ECB) কোথায় অবস্থিত?
৩ ‘ইউরোতে ২০ দেশ ক্রোয়েশিয়ায় শেষ, শেনজেনে ২৯ দেশ পাসপোর্টলেস প্রবেশ’ ইউরোজোনের বর্তমান সদস্য ২০টি (২০তম ক্রোয়েশিয়া, ২০২৩); শেনজেনের সদস্য ২৯টি দেশ (পাসপোর্টমুক্ত মুক্ত চলাচল)। ইউরোজোনের সদস্য কয়টি? সর্বশেষ সদস্য কে? শেনজেন অঞ্চলের সদস্য সংখ্যা কত?
৪ ‘১৬-এর জুনে ভোটে ছাড়ে, ২০-এর জানুয়ারিতে ব্রিটেন ইইউ কাটে’ ২৩ জুন ২০১৬ ব্রেক্সিট গণভোটে ৫২% নাগরিক ইইউ ত্যাগের পক্ষে ভোট দেয় এবং ৩১ জানুয়ারি ২০২০ যুক্তরাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে ইইউ ত্যাগ করে। ব্রেক্সিট গণভোট কবে অনুষ্ঠিত হয়? যুক্তরাজ্য কবে আনুষ্ঠানিকভাবে ইইউ ত্যাগ করে?
৫ ‘কাউন্সিল অব ইউরোপ আলাদা ভাই, স্ট্রাসবার্গে ৪৬ দেশ মানবাধিকারের গান গাই’ কাউন্সিল অব ইউরোপ (CoE) ইইউ-র অংশ নয়; এটি স্ট্রাসবার্গে অবস্থিত ৪৬ সদস্যের মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থা (রাশিয়া বহিষ্কৃত ২০২২)। কাউন্সিল অব ইউরোপের সদর দফতর কোথায়? রাশিয়াকে কবে বহিষ্কার করা হয়?